Wednesday, October 21, 2015

মহরম মাসের (৯,১০,১১ তারিখ) রোজা রাখার ফজিলতঃ



★ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী: “আমি আল্লাহর নিকট প্রতিদান প্রত্যাশা করছি আরাফার রোজা বিগত বছর ও আগত বছরের গুনাহ মার্জনা করবে। আরও প্রত্যাশা করছি আশুরার রোজা বিগত বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।”[সহিহ মুসলিম (১১৬২)]

★ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “ফজিলতপূর্ণ দিন হিসেবে আশুরার রোজা ও এ মাসের রোজা অর্থাৎ রমজানের রোজার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যত বেশি আগ্রহী দেখেছি অন্য রোজার ব্যাপারে তদ্রূপ দেখিনি।”[সহিহ বুখারি (১৮৬৭)]

★ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় এলেন তখন দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তখন তিনি বললেন: কেন তোমরা রোজা রাখ? তারা বলল: এটি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেছেন; তাই মুসা আলাইহিস সালাম এ দিনে রোজা রাখতেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমাদের চেয়ে আমি মুসার অধিক নিকটবর্তী। ফলে তিনি এ দিন রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।”
(বুখারি ১৮৬৫)
(মুসলিম, ১১৩০)।

★ ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: আশুরার রোজা সকল সগিরা গুনাহ মোচন করে। হাদিসের বাণীর মর্ম রূপ হচ্ছে- কবিরা গুনাহ ছাড়া সকল গুনাহ মোচন করে দেয়। এরপর তিনি আরও বলেন: আরাফার রোজা দুই বছরের গুনাহ মোচন করে। আর আশুরার রোজা এক বছরের গুনাহ মোচন করে। মুক্তাদির আমীন বলা যদি ফেরেশতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যায় তাহলে পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়... উল্লেখিত আমলগুলোর মাধ্যমে পাপ মোচন হয়। যদি বান্দার সগিরা গুনাহ থাকে তাহলে সগিরা গুনাহ মোচন করে। যদি সগিরা বা কবিরা কোন গুনাহ না থাকে তাহলে তার আমলনামায় নেকি লেখা হয় এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। ... যদি কবিরা গুনাহ থাকে, সগিরা গুনাহ না থাকে তাহলে কবিরা গুনাহকে কিছুটা হালকা করার আশা করতে পারি।[আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড-৬]

★ ইবনে তাইমিয়া বলেন: পবিত্রতা অর্জন, নামায আদায়, রমজানের রোজা রাখা, আরাফার দিন রোজা রাখা, আশুরার দিন রোজা রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে শুধু সগিরা গুনাহ মোচন হয়।[আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, খণ্ড-৫]

★ নবীজী মহররম মাসকে আল্লাহর সাথে সম্বন্ধ করে ‘শাহরুল্লাহিল মহররম’ বলেছেন, যা এ মাসের মর্যাদা বহন করে। (মুসলিম, হা-১৯৮২)।

★ রাসূল সা: বলেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররমের রোযা (আশুরার রোজা) এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ নামাজ)।’ (মুসলিম, হা-২০৩৯)।

★ আয়েশা রা: বলেন, ‘জাহেলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা রাখত, নবীজীও রাখতেন। মদিনায় হিজরতের পরও নবীজী রোজা রেখেছেন এবং লোকেদের রোজা রাখার জন্য বলেছেন। কিন্তু যখন রমজানের রোজা (দ্বিতীয় হিজরিতে) ফরজ হলো তখন তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছা আশুরার রোজা করতে পারো এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করো আশুরার রোজা ত্যাগ করতে পারো।’ (বুখারি, হা-২০০২)।

★ হজরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর সব রোজার (নফল) মধ্যে আশুরার রোজা সর্বশ্রেষ্ঠ’ (জামে তিরমিযি ১/১৫৬)।

★ পবিত্র আশুরার দিন রোজা রাখার ফযিলত সম্পর্কে তিনি আরও বলেন,
‘আমি আশা করি যে ব্যক্তি ‘আশুরা’ দিবসে রোজা রাখবে তার এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা (ক্ষমা) হয়ে যাবে’ (মুসলিম, ১/৩৬৭)।

★ আশুরার দিন রোজা রাখলে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায় বিধায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার আগের দিন বা পরের দিন আরেকটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন (মুসনাদে আহমদ)।


★ ইবনে আব্বাস রা:-এর অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘লোকেরা বলল, হে রাসূল! ইহুদি ও নাসারাগণ ১০ মহররমকে সম্মান করে। তখন নবীজী বললেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ মহররমসহ রোজা রাখব।’ রাবি বলেন, আগামী বছর আসার আগেই নবীজীর মৃত্যু হয়। (মুসলিম, হা-১১৩৪)।

★ নবীজী বলেন, তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিপরীত করো। তোমরা আশুরার সাথে তার পূর্বে বা তার পরে এক দিন রোজা রাখবে।’ (বায়হাকি)।

মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা উত্তম।






Monday, October 19, 2015

ইতিহাস ও সহিহ হাদিসের কাঠগড়ায় ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়াঃ

ইয়াজিদের প্রশংসায় ডঃ জাকির নায়েক বলেছে (রহিমুল্লাহ)। তারা কোন ইমামগন কে যদি মানত বা শুনত তবে ইয়াজিদকে হয় লানত দিত নয়ত তার ব্যাপারে চুপ থাকত কিন্তু তারা সেটা না করে ইয়াজিদকে ভাল প্রচার করতে চেয়েছে। মিথ্যাবাদী দের উপর আল্লাহর লানত।

তাদের ব্যাপারে হাদিসটি মিলে যায়ঃ







  • আল্লামা ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

মদীনা মুনাওওয়ারাহ থেকে একটি দল দামেশকে ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়ার সাথে সাক্ষাতের জন্য আগমণ করলেন। সে তাদেরকে ভালভাবে আপ্যায়ণ করল এবং অনেক উপহার প্রদান করল। এ দলের আমীর ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন হানযালা। 
(তিনি সাহাবী ছিলেন। তাঁর বাবা হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু উহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন যাকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছিলেন।যাক,দামেশকে অবস্থানকালে তাঁরা ইয়াযিদের সীমালঙ্ঘন নিজ চক্ষে দেখেছিলেন যা তাদেরকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছিল।)
অতঃপর তাঁরা যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, মদীনা মুনাওওয়ারার সবাইকে জানিয়ে দিলেন ইয়াজিদের নানান অপকর্মের কাহিনী। বিশেষ করে মদ পান করা, মাতাল হয়ে নামাজ ছেড়ে দেয়া ছাড়াও আরো বিভিন্ন অপকর্মের কথা। মসজিদে নববীর মিম্বরের সামনে সবাই এসে উপস্থিত হলেন। ইয়াযিদকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করলেন। তার নিকট বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানালেন। সংবাদ পৌঁছে গেল ইয়াজিদের নিকট। ইয়াযিদ (ক্ষিপ্ত হয়ে) মুসলিম বিন উকবার অধীনে একটি সেনাদল প্রেরণ করল। যখন দল্টি মদীনায় পৌঁছল, মুসলিম বিন উকবাহ তার বাহিনীকে মদীনা মুনাওওয়ারা তিনদিনের জন্য হালাল ঘোষণা দিল। (অর্থাৎ তিনদিনে তারা মদীনায় ইচ্ছেমত যা কিছু করার করতে পারবে, কোন বাধা থাকবেনা।) 
এ তিন দিনে ইয়াজিদের বাহিনী অনেক মানুষ হত্যা করেছিল।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এসময় ইয়াযিদের বাহিনী ৭০০জন হাফিযে কোরআনকে হত্যা করেছিল। এর মধ্যে তিনজন ছিলেন সাহাবী।
এ ঘটনাকে ইতিহাসে হাররার ঘটনা বলে অভিহিত করা হয়েছে।

সুত্রঃ
আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ
ষষ্ট খন্ড
অধ্যায়ঃ আল ইখবারু আন ওয়াকআতিল হাররাহ।
এ ঘটনাকালে ইয়াযিদ বাহিনী মানুষ হত্যা, সম্পদ লুন্ঠন এবং নারী ধর্ষণ-সব কিছুই করেছিল।
সুত্রঃ
আত তাবারীঃ ৫/৪৮৪
আল কামিলঃ ৪/১১২
আল বিদায়াহঃ৮/২১৮



  • এ ঘটনাকালে মুসলমানের রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল মদীনার রাস্তাগুলো। মুসলমানের রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওযা মোবারক পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মসজিদে নববী রক্তে ভরে গিয়েছিল। ১০০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। ধর্ষণের ফলে ১০০০ জারজ সন্তান জন্ম নিয়েছিল।

সুত্রঃ
আত তাযকিরাহ
ইমাম ইবনুল জাওযী
পেইজঃ ৬৩,১৬৩


  • নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনাটি ঘটবে, তা জানতেন। হযরত আইয়ুব বিন বুশাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেকবার কোন এক সফরে বের হলেন। অতঃপর হাররা নামক স্থান অতিক্রম করতে গিয়ে থেমে গেলেন অতঃপর ফিরে আস্তে চাইলেন। সাহাবীদের নিকট বিষয়টি ঠেকল। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, কী দেখলেন (ওখানে)? তিনি বললেন, এটা তোমাদের কোন সফরের পথ হতে পারেনা। সাহাবাগণ বললেন, সেটা কী হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, এ হাররা নামক স্থানে আমার সাহাবীদের পর আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ লোকদেরকে হত্যা করা হবে।

সুত্রঃ
দালাইলুন নুবুওওয়াহ
ইমাম বাইহাকী
হাদীস নাম্বারঃ ২৮১৭



  • হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

ঐতিহাসিকগণ হাররার ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে ঘটনায় ৮০জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর আর কোন বদরী সাহাবী জীবিত থাকেন নি।
সুত্রঃ
ফতহুল বারী:৮/৬৫১

  • ইবনে তাইমিয়াহ বলেন,

ইয়াজিদের শাসনকালে একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। মদীনাবাসী তার নিকট বাইয়াত গ্রহন অস্বীকার করেছিলেন এবং সরকারী কর্মকর্তাকে তাঁর পরিবার সহ মদীনা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। (মূলতঃ ফাসিক ইয়াজিদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তারা তাকে সপরিবারে বের করে দিয়েছিলেন, যা ইমাম ইবনে হাজার তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন)। অতঃপর ইয়াযিদ একটি সেনাদল প্রেরণ করল। মদীনায় পৌঁছে তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আর এটা ছিল ইয়াজিদের নির্দেশে এক অত্যাচার আর সীমালংঘনের নিদর্শন।

সুত্রঃ
মাজমুউল ফাতাওয়া:৩/৪১২


  • সহীহ হাদীসঃ এক 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি মদীনা বাসীর উপর অত্যাচার করে এবং তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে, তুমি তাকে ভয় প্রদর্শন কর। এমন ব্যক্তির উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং সকল মানুষের লা’নত বর্ষিত হোক।

রেফারেন্সঃ
মু’জামুল আওসাত লিত তাবারানীঃ২/১২৫/১
আস সিলসিলাতুস সাহীহাহ লিল আলবানীঃ১/৬২০, ১/৩৫১
আলা মাজমা’ লিল হাইসামীঃ৩/৩০৬


কী বুঝলেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা আক্রমণকারীর উপর লা’নত দিয়েছেন। সহীহ হাদীস তার প্রমাণ। ইতিহাসবিদ্গণ ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন, ইয়াযিদের নির্দেশে মদীনা শরীফে হত্যা, লুঠ, ধর্ষণ হয়েছে। সহীহ হাদীস বলছে, এই পাপিষ্ঠ লা’নত পাবার উপযুক্ত।


  • সহীহ হাদীসঃ দুই


হযরত সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মদীনাবাসীর প্রতি মন্দ আচরণ করার ইচ্ছা পোষণ করবে, (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাকে (তার শরীরকে) এমনভাবে গলিয়ে ফেলবেন, যেমনভাবে পানিতে লবন গলে যায়।

সুত্রঃ
সহীহ বুখারী
কিতাবু ফাদাইলিল মাদীনাহ:৩/২৭
হাদীস নাম্বারঃ ১৭৭৮
সহীহ মুসলিমে বলা হয়েছে, তার দেহ শীশা দ্বারা গলিয়ে দেয়া হবে।
সহীহ মুসলিম
কিতাবুল হাজ্জ:৪/১১৩

আর হাফিয ইবনে হাজারের কথা অনুসারে সকল ঐতিহাসিকগণ একমত হয়েছেন যে ইয়াযিদ শুধু মন্দ আচরণ ই করে নাই, তার নির্দেশে মদীনা মুনাওওয়ারাতে সাহাবীদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা শহীদ হয়েছেন।
এবার বলুন, 
উপরে উল্লেখিত সহীহ হাদীস পড়ার পর যখন আপনি শুনবেন কোন লোক বা কোন এক গোষ্ঠী রাসুলের মদীনা মুনাওওয়ারাকে অসম্মানকারী নরাধম ইয়াযিদের নামের সাথে রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলবে, তখন তাদেরকে আপনার কী বলা উচিৎ?




Sunday, October 18, 2015

জাবির (রাঃ) এর হাদিসে নুরের বিশ্লেষন (পর্ব ২)


★ ইমাম বায়হাকী [Born : 384 AH/994 CE, Died : 458 AH/1066 CE]

তিনি উক্ত বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ খানা নিজ কিতাবে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ইমাম বায়হাক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বলা হয় – ” ইমাম বায়হাক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন স্বীয় যুগের হাদীস শরীফ এবং ফিক্বাহ শাস্ত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব। উম্মত যাদের মাধ্যমে খুব উপকৃত হয়েছে এবং হাফিজে হাদীস এমন সাত ব্যক্তি ছিলেন তাদের যাদের গ্রন্থ সবচাইতে উৎকৃষ্ট বলে স্বীকৃত। সেই সাত জনের একজন হলেন, ইমাম বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ।”

রেফারেন্স :

আসমাউর রেজাল-বাবু আইম্মাতুল হাদীস।

★ এই জগৎবিখ্যত মুহাদ্দিস ইমাম, আল্লামা বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে বর্ননা করেন–

ان الله تعالي خلق قبل الاشياء نور نبيك

“….. নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম উনার নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর “নূর” মুবারক সৃষ্টি করেন।”

রেফারেন্স :

দালায়েলুন নবুওয়াত লিল বায়হাক্বী ১৩ তম খন্ড ৬৩ পৃষ্ঠা।

_________________________________________________

★ বিখ্যাত সুফী সাধক ইমাম আব্দুর রহমান জামী (রহঃ) [১৪১৪- ১৪৯২ ইং]

তিনি হাকিকতে নুরে মুহাম্মাদী (সাঃ) কে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলে রায় দিয়েছেন। যা জাবির (রাঃ) এর হাদিসের বর্ননাকে সাপোর্ট দেয়।





_________________________________________________

★ মোল্লা আলি কারী (রহ) [ওফাত ১০১৪ হিজরি] : 

মিরকাত শরহে মিশকাত : অধ্যায় : ইমান বিল ক্বদর
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ :

এখানে ↓ কলম সৃষ্টির হাদিসটি বিবৃতি করে তার ব্যাখ্যায় অন্যান্য প্রথম সৃষ্টি গুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে 
মোল্লা আলী কারী (রহ) বলেন, " বাস্তবিক পক্ষে প্রথম সৃষ্টি হচ্ছে নুরে মুহাম্মাদী (দুরুদ) যেমন আমি আমার আল মাওরিদ লিল মাওলিদ (১ম খন্ড ১৬৮ পৃষ্ঠা, হাদিস ৯৪) এ উল্লেখ করেছি।
যেমন বর্ননায় এসেছে - 
আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নুর সৃষ্টি করেছেন,
অন্য বর্ননায় প্রথমে আমার রুহ সৃষ্টি করেছেন। (সংক্ষেপিত)







(ii) কিতাব : আল মওলিদুর রাভীঃ

এই "আল মওলিদুর রাভী" কিতাবে মোল্লা আলি কারী (রহঃ) -- 
``` নুর সম্পর্কিত জাবির (রা) এর হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন।```
``` অতঃপর নুর সম্পর্কে সুবিশাল আলোচনা করেছেন এবং সর্বপ্রথম নুরে মুহাম্মাদী (সাঃ) এর সৃষ্টি বলে মত দিয়েছেন।```


উক্ত কিতাবের নুর সম্পর্কিত সমস্ত আলোচনা দেখুন :










(iii) মোল্লা আলী কারি (রহ) বলেন,

সৃষ্টির সর্বত্র প্রিয় নবীর নুরানী সত্ত্বাই সর্বাধিক পরিচিত ও প্রকাশিত। আল্লাহ পাক তারই নুরানী সত্ত্বাকে সর্বাগ্রে সৃষ্টি করেছেন।

Reference :

মওদ্বুয়াতুল কবীর : ৮৬ পৃষ্ঠা

(iv) তিনি আরো বলেন,
"সর্বপ্রথম সৃষ্টি সেই মহান নুর যার দ্বারা রাসুল পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সৃষ্টি করা হয়েছে।

Reference :

শরহে শামায়েলে তিরমিযি ১ম খন্ড, ১৪৬ পৃষ্ঠা


______________________________________________________


★ ইমাম সুয়ুতী (রহ) তাখরিজ হাদিস (শরহে মাওয়াকিফ) এ বলেন, এর কোন নির্ভরযোগ্য সনদ নেই।
এই কিতাবটি তিনি আগে লিখেছিলেন তখন হয়ত তিনি ওই হাদিসের সনদ পান নি কিন্তু পড়ে যখন পেয়েছেন তখন তার সমর্থনে "খাইসাইসুল কুবরায় পুনরায় সংশোধন স্বরুপ সমাধান দিয়ে গেছেন। যেমন,

★ আল-ঘুমারি (ওহাবী মুহাদ্দিস) বলেন, ইমাম সুয়ুতী (রহ) তার ""খাসাইস"" কিতাবে এই হাদিসটি ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ) এর থেকে বর্ননা বলে সমর্থন দিয়ে লিখেছেন।


★ উল্লেখ্য যে,
**“আল্লামা সুয়ুতী (রহ:) এর [জন্ম ৮৪৯ হিজরী আর ওফাত ৯১১ হিজরী]
** অপর দিকে আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আহমদ কুস্তালানি রহঃ এর [জন্ম ৮৫১ হিজরী আর ওফাত ৯২৩ হিজরী] ।

______________________________________________________


★ ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ) বলেন,

আল্লাহ পাক নুর তবে অন্যান্য নুরের মত নন। আর নবী করিম (সা) এর রুহ মুবারক হচ্ছে তার (আল্লাহর) নুরের ঝলক। আর ফেরেশতাগন হচ্ছেন তার (রাসুলের) নুরের শিখা। যেমন রাসুল (সা) ইরশাদ করেন,

"আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নুর সৃষ্টি করেছেন আর আমার নুর থেকে আল্লাহ প্রত্যেক কিছু সৃষ্টি করেছেন।

Reference :

ইমাম মাহদী আল ফার্সী : মাতালিউল মুসাররাত : ২১ পৃ:


★ ইমাম যুরকানী (রহ) বলেন,

হাদিসে পাকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হিসেবে "আকল" "কলম" ও " আমার নুর" তিনটি বস্তু মুলত নবীকুল সম্রাট এর নুর মুবারককেই বুঝানো হয়েছে। সর্বাগ্রে, নিরেট ও নির্ভেজাল অস্তিত্বময় একমাত্র তারই সত্ত্বা।

Reference :

শরহে মাওয়াক্কিফ : ৭ম খন্ড : ২৫৪ পৃ

★ ইমাম শারানী (রহ) বলেন,

নুর কিংবা আকল পরস্পর বৈপরিত্য নেই। এগুলো হাকিকতে মুহাম্মদী (সা) এর বহুমুখী পরিচিতি।

Reference :

ইমাম শারানী : ইয়াকুত ওয়াল জাওয়াহির : ২য় খন্ড ২০ পৃ


★ ইমাম মুহম্মদ মাহদ ইবনে আহমদ ফার্সী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস শরীফকে ""সহীহ "" বলে নিজের কিতাব মুবারকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ননা করেন – 

اول ما خلق الله نوره ومن نوري خلق كل شءي

অর্থ : মহান আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন এবং আমার নূর মুবারক থেকে সবকিছু সৃষ্টি করেন।”

দলীল-
√ মাতালেউল মাসাররাত ২৬৫ পৃষ্ঠা ।

★ Fasi (Muhammad ibn Ahmad d. 1052) cites it as evidence in Matali` al-masarrat (p. 210, 221 of the Matba`a al-taziyya edition) and says: "These narrations indicate his primacy (awwaliyya) and priority over all other creations, and also the fact that he is their cause (sabab)."

★ Diyarbakri (Husayn ibn Muhammad d. 966): He begins his 1,000-page history entitled Tarikh al-khamis fi ahwal anfasi nafis with the words: "Praise be to Allah Who created the Light of His Prophet before everything else," which is enough to disprove al-Ghumari's exaggerated claim that "anyone who reads it will be convinced that the hadith is a lie." Then Diyarbakri cites the hadith as evidence (1:19 of the Mu'assasat Sha`ban edition in Beirut).


★ ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী [ওফাত ৯৭৪ হি] :

তিনি তার বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব [Fatawa hadithiyya (p. 247 of the Baba edition in Cairo)] তে বলেছেন যে এই হাদিসটি ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ) বর্ননা করেছেন এবং তিনি তার রচিত কবিতায় মধ্যেও এটা বলেছেন।
ইবনে হাজর হায়তামী তার বিখ্যাত গ্রন্থ [Al-Ni`mat al-kubra `ala al-`alamin (p. 3)]


★ মোল্লা আলি কারী (রহ) [ওফাত 1014 হিজরি]
তিনি বলেন,

ومنه قوله اول ما خلق اللّه نورى وفى رواية روحى ومعناهما واحد فان الارواح نورانية اى اول ما خلق اللّه من الارواح روحى

প্রথম বস্তু যা আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন তা হল আমার নুর এবং অন্য বর্ননায় এসেছে যে "রুহ" এবং এই দুইটার অর্থ একই কারন "রুহ" হল নুরানী। এই হাদিসের অর্থ এটাও যে আল্লাহ সমস্ত "রুহের" সৃষ্টির পুর্বে আমার "রুহ" পাক সৃষ্টি করেছিলেন। [Mirqaat alMafateeh]


★ আলি ইবনে বুরহান উদ্দিন হালাবী [ওফাত, ১০৪৪ হিজরি] তিনি বিখ্যাত [As- Sirah Al-Halabi (1:31 of the Maktaba Islamiyya edition in Beirut)] কিতাবে দলিল হিসেবে বর্ননা করে বলেন, এই হাদিস টি এটাই প্রমান করে যে সমস্ত সৃষ্টির মুল হল রাসুলুল্লাহ (সা) কে সৃষ্টি এবং আল্লাহ ভাল জানেন।"

★ ইসলাইল হাক্কী [বিখ্যাত মুফাসসির, ওফাত ১১৩৭] তিনি তার বিখ্যাত তফসীর ""রুহুল বয়ান"" বলেন, আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম রাসুলুল্লাহ (সা) এর নুর মুবারক সৃষ্টি করেছেন এবং ওনার (অস্তিত্বের) কারনেই সমস্ত কিছুর (অস্তিত্ব) সৃষ্টি। ইমাম ইউসুফ নাবহানী (রহ) তার [Jawahir al-bihar (p. 1125)] কিতাবে এই হাদিসটি দলিল স্বরুপ বর্ননা করেছেন।


★ ইমাম আজলুনী (রহ) বলেন, " এ ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ) এর রেওয়াত যিনি নিজ সনদে তা বর্ননা করেছেন "From : 'Ajluni (Isma`il ibn Muhammad d. 1162)
Book : Kashaf Al Khifa
Volume : 1
Page : 311
Hadith number : 827

★ ইমাম ইয়দারুসি (রহ) বলেন," এ ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ) এর রেওয়াত যিনি স্বয়ং নিজ সনদে বর্ননা করেছেন "
From : 'Iydarusi
Book : Tarekh An Nur as Saafir
Volume : 1
Page : 8


★ ইমাম আহমদ আবেদিন শামী (রহ) [(1198–1252 AH ]
 হানাফী মাযহাবের বিশ্ববিখ্যাত শ্রেষ্ঠ ফতোয়া ""ফতোয়ায়ে শামী"র প্রনেতা তিনি একে দলিলস্বরুপ গ্রহন করেছেন,"


★ মালিকি আল-হাসানী (মুহাম্মদ ইবনে আলাভী) তিনি মোল্লা আলি কারি (রহ) এর মিলাদ সম্পর্কিত বইয়ের ব্যাখ্যাগ্রন্থ "" [Hashiyat al-Mawrid al-rawi fi al-mawlid al-nabawi (p. 40)] বলেন :

** "নুর সম্পর্কিত জাবির (রা) এর হাদিসটির সনদ (Chain) কোন রকম আপত্তি ব্যতিরেকে সহীহ (Sound) কিন্তু বিভিন্ন Scholars এর বিষেশত্ব অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ননা করেছেন।

**"ইমাম বায়হাকীও এটা সামান্য পরিবর্তন সহকারে বর্ননা করেছেন।" তারপর তিনি বলেন বিভিন্ন বর্ননা রাসুলুল্লাহ (সা) এর নুর সম্পর্কিত বর্ননাকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

★ বিখ্যাত মুহাদ্দিস, আল্লামা আবুল হাসান বিন আব্দিল্লাহ আল বিকরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন — 

قال علي رضي الله عنه كان الله ولا شيء معه فاول ما خلق نور حبيبه قبل ان يخلق الماء والعرش والكرسي واللوح والقلم والجنة وانار والحجاب

অর্থ: হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম বলেন, শুধুমাত্র আল্লাহ পাক ছিলেন, তখন অন্য কোন অস্তিত্ব ছিলো না। অতঃপর তিনি পানি,আরশ,কুরসী, লওহো,ক্বলম,জান্নাত, জাহান্নাম ও পর্দা সমূহ ইত্যাদি সৃষ্টি করার পূর্বে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন।”

দলীল-
√ আল আনওয়ার ফী মাওলিদিন নাবিয়্যিল মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫ পৃষ্ঠা।



★ ইমাম আব্দুল গনী নাবলুসী (রহ) হযরত যাবির (রা) এর সনদ সম্পর্কে বলেন,
"রাসুলুল্লাহ (সা) এর নুর মুবারক থেকে সবকিছু সৃষ্টি। উক্ত বর্নিত হাদিসটির সনদ সহিহ।

Reference :

ইমাম নাবলুসী : হাদিকাতুল নাদিয়া : ২/৩৭৫ পৃ:


★ বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইসমাইল হাক্কী (রহ) :

সুরা যুখরুফ ৮১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় একটি হাদিস উল্লেখ করেন,
ইমাম জাফর সাদেক (রহ) বলেন,
আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম নুরে মুহাম্মাদী (সা) কে সৃষ্টি করছেন।

Reference :

ইসমাইল হাক্কী : রুহুল বয়ান : ৮/৩৯৬ পৃ: সুরা যুখরুফ : ৮১

★ হযরত আব্দুল কাদীর জিলানী (রহ) বলেন,
পরম গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত আল্লাহ পাক বলেছেন,
আমি আমার নিজ জাতের কুদরতী জামালের নুর হতে মুহাম্মদ (সা) এর রুহ সৃষ্টি করেছি।
এর প্রমান হল রাসুলুল্লাহ (সা) এর হাদিস আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হল আমার নুর মুবারক।

Reference :

ইমাম শাতনুফী : বাহজাতুল আসরার : ১২ পৃ

★ ইমাম বদরউদ্দিন আঈনি (রঃ) বলেনঃ


,”আল্লাহ্‌ সর্বপ্রথম মুহাম্মদ (সঃ) এর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন। “

[Umdat ul Qari, Sharh Sahih Bukhari, Volume No. 15, Page No. 109]



★ ইমাম নিশাবুরি (নিজামউদ্দিন ইবনে হাসান, ওফাত ৭২৮ হি:) দলিলস্বরুপ (evidence হিসেবে) গ্রহন করেছেন, "
[সুরা জুমার (৩৯.১২) ‘ আমাকে আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি প্রথম মুসলিম হই।’] এই আয়াতের তফসীরে [Ghara'ib al-Qur'an (8:66 of the Baba edition in Cairo).]


★ ইমাম ইউসুফ আল-সাইয়্যিদ হাসিম (রিফাই) বলেন যে এটা ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ) বর্ননা করেছেন এবং এটা দলিল স্বরুপ।
Adillat ahl al-sunna wa al-jama`a al-musamma al-radd al-muhkam al-mani` (p. 22)



★ আব্দুল হাই লাখনভী (মৃত্যু ১৩০৪) :


(i) আব্দুল হাই লাখনভী তার [ al-Athar al-marfu`a fi al-akhbar al-mawdu`a (p. 33-34 of the Lahore edition) ] বলেন :

"মুহাম্মদ (সা) এর নুর সম্পর্কিত হাদিসটি (al-nur al-muhammadi)
প্রাথমিকভাবে ইমাম আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হুমাম (রহ) এর বর্নিত হাদিসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত, যা যথার্থভাবে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর উপরে (রাসুলুল্লাহ সা. এর নুরকে) নির্দিষ্টভাবে অগ্রাধিকার দেয়।

(ii) আব্দুল হাই লাখনাভী লিখেছেনঃ
হুজূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীর মোবারাকের কোন ছায়া ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন নূর।
(তালিকুল আযিব লি হাল্লি হাসিয়াতুল যালালি মানতিকিত তাহাযিল)

______________________________________________________

★ উপমহাদেশের বিখ্যাত ইমাম আল্লামা শফী উকারবী (রহঃ) : তার যিকর-ই-হাসীন কিতাবে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে নুরনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে এই হাদিসটি বিস্তারিত বর্ননা করেছেনঃ

















______________________________________________________


★ হাকিমুল উম্মাহ মুফতী ইয়ার খান নইমী (রহঃ)

কিতাবঃ মিরাতুল মানাজীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ

মোল্লা আলী কারি (রহঃ) এর মিরকাত শরহে মিশকাত এর মত একই
অধ্যায় : ইমান বিল ক্বদর
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : এর অনুরুপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন অতি সংক্ষেপেঃ













Saturday, October 17, 2015

নুরে মুহাম্মাদী (দঃ) সম্পর্কে মোহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) এর আকিদাঃ (মাদারিজুন নবুওয়াত)

































কুরআন-হাদিস পড়ে কেউ হেদায়াত পাবে, কেউ বা পথভ্রষ্ট হবেঃ



  • ★ হাদিস জানার আগে তার চেয়ে বেশি জরুরী হল তার ব্যাখ্যা জানা।-- ইমাম ইবনে সীরিন (রহঃ) [ওফাত ১১০ হি]



  • ★ আল্লাহ পাক আল কুরআনে ইরশাদ করেন,



هُوَ الَّذِيَ أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ في قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاء الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاء تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلاَّ اللّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلاَّ أُوْلُواْ الألْبَابِ 
07
তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।
সুরা আল-ইমরান ৭


  • ★ এ (কুরআন) দ্বারা আল্লাহ তা'আলা অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন কাকেও বিপথগামী করেন না। [সুরা বাকারা: ২৬]




  • ★ হাদিসে এসেছে -



عن أبي سعيد الخدري ، أنه كان إذا رأى الشباب قال : مرحبا بوصية رسول الله صلى الله عليه وسلم ، أوصانا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نوسع لكم في المجلس ، وأن نفهمكم الحديث . فإنكم خلوفنا ، وأهل الحديث بعدنا

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হইতে বর্ণিত, তিনি যখন কোন যুবককে দেখতেন তখন বলতেন- তোমাদের জন্য রাসুল সা. এর অসিয়ত সম্পন্ন ধন্যবাদ, রাসুল সা. আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা যেন তোমাদের জন্য মজলিস প্রসস্ত করি এবং তোমাদেরকে
 যেন হাদীস শিক্ষা দিই। তোমরা আমাদের পরবর্তী অনুসারী এবং আমাদের পরে তোমরা আহলে হাদীস।

** মুসতাদরাকে হাকেম১/৮৮, 
** শরফে আসহাবে হাদীস ২১

এই হাদিস দ্বারা আহলে হাদিস ফির্কা গুলো তাদেরকে সঠিক প্রমান করতে ফতোয়া দেয়। অথচ তারা বুখারী মুসলিম ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন হাদিসের কিতাব গুলোকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। তাদের দৃষ্টিতে লক্ষ লক্ষ হাদিস মুখস্ত করেও ইমামগন জাল হাদিস চিনে নি তাই সেসকল জাল হাদিস তাদের কিতাবে নিয়েছে। তারা সহিহ হাদিস এর কথা বলে বলে জয়ীফ হাদিস গুলোকে ত্যাগ করে বসে অথচ সেগুলোও হাদিস যা স্বয়ং নবীজীর কথা। তাদের বিরোদ্ধে কোন হাদিস গেলেই তাকে জাল জয়ীফ প্রমান করায় উঠে পড়ে লাগে।
৪ মাযহাবের ইমামগনকে পর্যন্ত অনুসরণ করে না এই বলে যে তারা নাকি শুধু কুরআন হাদিস মানে। আর মাযহাব মানা বিদাত।

(A) গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী : নবুয়্যতের মিথ্যা দাবীদারঃ


  • ★ কোরআন দিয়ে তার নবুওয়াত প্রমান করার অপপ্রয়াস-


َمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ

এবং মরিয় পুত্র ঈসা বলল হে বনি ইসরাঈল আমি আল্লাহর রাসূল আমি বিদ্যমান থাকা তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারী এবং এমন এক নবীর সুসংবাদদানকারী যিনি আমার পরে আসবেন এবং যার নাম হবে আহমদ।সুরা আসসাফ/৬। 

গোলাম আহমদ দাবী করে এখানে আমি আহমদের কথা বলা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।


(B) এমনিভাবে শিয়া, খারেজী, মুতাযিলা, বাহাই, কদরিয়া, জবরিয়া, কবরপুজারী, মাজারপুজারী ভন্ড, গোমরাহ, পথভ্রষ্ট সকল দলই কোরান দিয়ে তাদের দলকে উন্নিত করতে চায়।

(C) নামধারী আহলে হাদীসদের দাবী যদি সত্যি হয় তাহলে, 


  • হাদীস অস্বিকারকারী নামধারী আহলে কোরআনরদের দাবী- 

যে আমাদের প্রসংসা করা হয়েছে হাদীস শরীফে তা সত্যি হবে না কেন? যেমন-


عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ لِلَّهِ أَهْلِينَ مِنَ النَّاسِ "، فَقِيلَ: مَنْ أَهْلُ اللهِ مِنْهُمْ ؟ قَالَ: " أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللهِ وَخَاصَّتُهُ "

আনাস রা. হইতে বণ্যিত রাসূল সা. বলেন- নিশ্চয় মানুষে মধ্যে কতেক মানুষ আল্লাহর পরিবার ভুক্ত [নৈকট্য প্রাপ্ত]। জিজ্ঞাস করা হলো মানুষের মধ্যে কারা আহলুল্লাহ? রাসুল সা. বললেন “আহলে কোরান” তারা হলো আল্লাহর আহল ও আল্লাহর বিশেষ বান্দা।দেখুন- মুসনাদে আহমদ ১৯/২৯৬

আহলে কুরআন তো এমন এক মারাত্মক ফির্কা যারা কোন হাদিসই মানে না তারা শুধু কুরআন মানে।
অথচ আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করা ইমানদার দের জন্য ফরজ। বিস্তারিত দেখুন সুরা নিসা ৫৯ নং আয়াতে।
হাদীসে উল্লেখিত আহলে কোরআন মানে নামধারী আহলে কোরআন [মুনকারীনে হাদীস] নয়, বরং হোফফাজে কোরআন ও আমেলে কোরআন।দেখুন-মুসনাদে আহমদ ১৯/২৯৬


Thursday, October 15, 2015

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ৩)


একসাথে সকল পর্ব :

http://sunni-encyclopedia.blogspot.com/2015/10/blog-post_15.html?m=1

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ৩)
অনুবাদ : কাজী সাইফুদ্দীন হোসাইন

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)

[হালিমা (রা:) আরও বর্ণনা করেন] “আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সাথে করে ফেরত নিয়ে আসার দুই বা তিন মাস পরে আমরা আমাদের বাড়ির পেছনে নিজস্ব কিছু গবাদি পশুর যত্ন নেয়ার সময় তাঁর দুধ-ভাই (হালিমার ছেলে)
ছুটে আসে এই বলে চিৎকার করতে করতে – ‘আমার কুরাইশ-গোত্রীয় ভাইয়ের কাছে সাদা পোশাক-পরিহিত দু’জন মানুষ আসেন। তাঁরা তাঁকে শুইয়ে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করেন।’ ছেলের বাবা ও আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই। মহানবী (দ:) তখন দাঁড়ানো এবং তাঁর চেহারার রং বদলে গিয়েছে। তাঁর (পালক) বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে পুত্র! কী হয়েছে আপনার?’ সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, ‘সাদা পোশাক পরা দুই ব্যক্তি আমার কাছে আসেন। তাঁরা আমাকে শুইয়ে আমার বক্ষবিদীর্ণ করেন। অতঃপর তাঁরা (শরীরের) ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফেলে দেন এবং বক্ষ যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটি জোড়া লাগিয়ে দেন।’ আমরা তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসি এবং তাঁর (পালক) পিতা বলেন, ‘ওহে হালিমা! আমি আশংকা করি আমাদের এই ছেলের কিছু একটা হয়েছে। আরও খারাপ কিছু হওয়ার আগে চলো তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দিয়ে আসি!’

“আমরা রাসূল (দ:)-কে মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা তাঁকে নেয়ার জন্যে এতো আগ্রহ প্রকাশের পরে কী কারণে আবার ফেরত এনেছো?’ আমরা তাঁকে জানাই যে মহানবী (দ:)-এর খারাপ কিছু হতে পারে ভেবে আমরা শংকিত (তাই নিয়ে এসেছি)। আমিনা (রা:) বলেন, ‘তা হতে পারে না; তোমরা সত্য কথাটি বলো যে আসলে কী হয়েছে।’ তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার দরুন আমরা আসল ঘটনা খুলে বলি। এমতাবস্থায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি ভয় পেয়েছো যে শয়তান তাঁর ক্ষতি করবে? না, তা কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, শয়তান কোনোক্রমেই তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার এই ছেলে মহা সম্মানের অধিকারী কেউ হবেন। তোমরা এক্ষণে তাঁকে (আমার কাছে) রেখে যেতে পারো’!”

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা:) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি বনী সা’আদ ইবনে বকর গোত্রে (দুধ-মায়ের) লালন-পালনে থাকাকালীন একদিন আমার সমবয়সী ছোট ছেলেদের সাথে খেলছিলাম। এমনি সময়ে হঠাৎ তিনজন ব্যক্তি আবির্ভূত হন। তাঁদের কাছে ছিল বরফভর্তি সোনালী রংয়ের একখানা ধোয়াধুয়ি করার পাত্র। তাঁরা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করেন, আর আমার বন্ধুরা সবাই বসতীর দিকে দৌড়ে ফেরত যান। ওই তিনজনের মধ্যে একজন আমাকে আলতোভাবে মাটিতে শুইয়ে আমার বুক হতে তলপেটের হাড় পর্যন্ত বিদীর্ণ করেন। আমি তা দেখতে সক্ষম হই এবং আমার এতে কোনো ব্যথা-ই অনুভূত হয়নি। তিনি আমার নাড়িভুঁড়ি বের করে বরফ দ্বারা সেটি ভালভাবে কাচেন এবং আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন। দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে তাঁর সাথীকে সরে যেতে বলেন। অতঃপর তিনি তাঁর হাত ঢুকিয়ে আমার হৃদযন্ত্র বের করে আনেন, যা আমি দেখতে পাই। তিনি তা কেটে ওর ভেতর থেকে একটি কালো বস্তু বের করে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তাঁর দুই হাত ডানে ও বামে নাড়তে থাকেন, যেন হাতে কিছু একটা গ্রহণ করছিলেন। অকস্মাৎ তাঁর হাতে চোখ-ধাঁধানো আলোর একখানি আংটি দেখা যায়। তিনি আমার হৃদযন্ত্রের ওপর তা দ্বারা ছাপ বসিয়ে দেন, যার দরুন সেটিও আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


 এটি-ই নবুওয়্যত ও জ্ঞান-প্রজ্ঞার নূর (জ্যোতি)। অতঃপর তিনি আমার হৃদযন্ত্র যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেন এবং আমি সেই আংটির শীতল স্পর্শ দীর্ঘ সময় যাবত পাই। তৃতীয়জন এবার তাঁর সহযোগীকে সরে দাঁড়াতে বলেন। তিনি তাঁর হাত আমার বিদীর্ণ বক্ষের ওপর বুলিয়ে দিলে আল্লাহর মর্জিতে তা মুহূর্তে জোড়া লেগে যায় (অর্থাৎ, সেরে ওঠে)। এরপর তিনি সযত্নে আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন এবং প্রথমজনকে বলেন, ‘তাঁর জাতির দশজনের সাথে তাঁকে মাপুন।’ আমি তাদের চেয়ে ওজনে ভারী প্রমাণিত হই। অতঃপর তিনি আবার বলেন, ‘তাঁর জাতির এক’শ জনের সাথে তাঁকে পরিমাপ করুন।’ আমি তাদের চেয়েও ভারী হই। এবার তিনি বলেন, ‘তাঁকে তাঁর সমগ্র জাতির সাথে মাপলেও তিনি ভারী হবেন।’ তাঁরা সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরেন, কপালে চুমো খান এবং বলেন, ‘ওহে হাবীব (দ:)! আপনার জন্যে যে মঙ্গল ও কল্যাণ অপেক্ষা করছে তা জেনে আপনি খুশি-ই হবেন’।” এই হাদীসে পরিমাপ করার বিষয়টি হলো নৈতিকতা। অতএব, মহানবী (দ:) সবাইকে নৈতিকতা ও সদগুণাবলীতে ছাড়িয়ে গিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ’সীনা চাক’ (বক্ষ বিদারণ) জিবরাইল আমীন (আ:) কর্তৃক হেরা গুহায় ওহী বহন করে নিয়ে আসার সময় আরেকবার হয়েছিল; এছাড়া মে’রাজের রাতে ঊর্ধ্বগমনের সময়ও আরেকবার বক্ষবিদারণ হয়েছিল তাঁর। আবূ নুয়াইম নিজ ‘আদ্ দালাইল’ পুস্তকে বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বিশ বছর বয়সে আরও একবার ’সীনা চাক’ হয়েছিল। তাঁর শৈশবে এটি হওয়ার এবং কালো বস্তু অপসারণের হেকমত বা রহস্য ছিল তাঁকে সমস্ত ছেলেমানুষি বৈশিষ্ট্য হতে মুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্কদের (গুরুগম্ভীর) চিন্তা ও মননে বিভূষিত করা। তাঁর বেড়ে ওঠা তাই নিখূুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। তাঁর দু’কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে মোহরে নবুওয়্যতের সীলমোহর দেয়া হয়, যা থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হতো এবং যা দেখতে একখানা তিতিরজাতীয় পাখির ডিমের মতো ছিল।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) ছয় বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর মা আমিনা (রা:) ও উম্মে আয়মান (রা:) তাঁকে এয়াসরিবে (মদীনায়) অবস্থিত ’দারুল তাবে’আ’-তে তাঁরই বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রভুক্ত মামাদের বাড়িতে মাসব্যাপী এক সফরে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ওই জায়গায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তিনি স্মরণ করেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “এখানেই আমি ও আমার মা থেকেছিলাম। বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রের মালিকানাধীন হাউজ বা জলাধারে আমি সাঁতার শিখেছিলাম। একদল ইহুদী আমাকে দেখতে ঘনঘন এই স্থানে আসতো।” উম্মে আয়মান (রা:) বলেন, “আমি ইহুদীদের একজনকে বলতে শুনেছি যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম হলেন এই জাতির পয়গম্বর; আর এটি-ই হলো তাঁর হিজরতের স্থান। ইহুদীরা যা বলাবলি করেছিল, তার সবই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”


অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর মা মক্কা মোয়াযযমায় ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করেন। কিন্তু এয়াসরিবের অদূরে আল-আবূআ’ নামের জায়গায় পৌঁছুলে মা আমিনা (রা:) ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আল-যুহরী (রা:) হযরত আসমা’ বিনতে রাহম (রা:) হতে, তিনি তাঁর মা হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “আমি মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:)-এর শেষ অসুখের (মৃত্যুব্যাধির) সময় উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় মহানবী (দ:) ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু। তিনি যখন মায়ের শিয়রে বসা, তখন আমিনা (রা:) কিছু কবিতার ছত্র পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মোবারক চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন:‘(পৃথিবীতে) সকল প্রাণি-ই মৃত্যুবরণ করবে; যাবতীয় নতুন বস্তু-ও পুরোনোয় পরিণত হবে; আর প্রতিটি প্রাচুর্য-ও কমে যাবে; আমি মৃত্যুপথযাত্রী হলেও স্মৃতি আমার চিরসাথী হবে; আমি রেখে যাচ্ছি অফুরন্ত কল্যাণ এবং জন্ম দিয়েছি পুতঃপবিত্র সত্তাকে এই ভবে।’ এ কথা বলে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমরা তাঁর তিরোধানে জ্বিনদের কাঁন্নার আওয়াজ শুনতে সক্ষম হই।”

বর্ণিত আছে যে হযরত আমিনা (রা:) তাঁর ইন্তেকালের পরে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি শাহাদাত তথা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:) হতে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) আল-হাজূন নামের স্থানে পৌঁছুলে তিনি অন্তরে অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট হন। আল্লাহতা’লার যতোক্ষণ ইচ্ছা, ততোক্ষণ তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ওখান থেকে ফেরার পর তিনি খুশি হন এবং বলেন, “আমি আমার মহাপরাক্রমশালী ও মহান প্রভুর (খোদাতা’লার) দরবারে আরয করেছিলাম আমার মাকে তাঁর হায়াত (জীবন) ফিরিয়ে দিতে। তিনি তা মঞ্জুর করেন এবং তারপর আবার মাকে ফেরত নিয়ে যান (পরলোকে)।” আস্ সুহায়লী ও আল-খাতীন উভয়ই বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন যে আল্লাহ পাক হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতামাতা দু’জনকেই পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের প্রতি শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আল-কুরতুবী তাঁর ‘আত্ তাযকেরা’ গ্রন্থে বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও সদগুণাবলী তাঁর সারা (যাহেরী/প্রকাশ্য) জিন্দেগী জুড়ে প্রকাশমান ছিল। তাঁর পিতামাতাকে আবার জীবিত করে তাঁর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ইসলামী বিধানে বা যুক্তিতে এমন কিছু নেই যা এর বিরোধিতা করে।” পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যে বনী ইসরাঈল বংশের এক ব্যক্তি খুন হওয়ার পর তাকে আবার জীবিত করে খুনী কে ছিল তা জানানো হয়। অধিকন্তু, আমাদের পয়গম্বর ঈসা (আ:) [যীশু খৃষ্ট] মৃতকে জীবিত করতেন। অনুরূপভাবে, আল্লাহতা’লা আমাদের মহানবী (দ:)-এর দ্বারাও কিছু সংখ্যক মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। তাহলে রাসূল-এ-করীম (দ:) কর্তৃক তাঁর পিতামাতাকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি কেন অসম্ভব হবে, যেখানে এটি তাঁরই শান-শওকত ও মহিমা প্রকাশ করছে?


ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মতে, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের সকল পূর্বপুরুষ-ই মুসলমান। এটি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী থেকেও প্রমাণিত। তিনি (দ:) বলেন, “আমাকে পুতঃপবিত্র পুরুষদের ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র নারীদের গর্ভে স্থানান্তর করা হয়।” আর যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন, “নিশ্চয় অবিশ্বাসীরা নাজাস তথা অপবিত্র”, তাই আমরা (এ আয়াতের আলোকে) দেখতে পাই যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষদের কেউই অবিশ্বাসী ছিলেন না।

হাফেয শামস আদ্ দীন আদ্ দামেশকী (রহ:) এই বিষয়ে কী সুন্দর লিখেছেন:

“আল্লাহ পাক তাঁর নবী (দ:)-এর প্রতি নিজ আশীর্বাদ করেছেন বর্ষণ
এছাড়াও তিনি তাঁর প্রতি ছিলেন সর্বাধিক দয়াবান
তিনি তাঁর মাতা এবং পিতাকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের জীবন
যাতে তাঁরা করতে পারেন তাঁর নবুওয়্যতের সাক্ষ্যদান
নিশ্চয় তা ছিল সূক্ষ্ম করুণার এক নিদর্শন
অতএব, এসব অলৌকিকত্বে করো বিশ্বাস স্থাপন
কেননা, আল্লাহতা’লা এগুলোর সংঘটনকারী হিসেবে সামর্থ্যবান
যদিও বা এতে তাঁর সৃষ্টিকুলের শক্তি-সামর্থ্য ম্লান।”

সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের মায়ের ইন্তেকালের পরে উম্মে আয়মান (রা:) তাঁর সেবাযত্নের দায়িত্ব নেন। মহানবী (দ:) তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “আমার মায়ের পরে উম্মে আয়মান হলেন আমার (দ্বিতীয়া) মা।” রাসূলুল্লাহ (দ:) আট বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর দাদা ও অভিভাবক আবদুল মোত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল এক’শ দশ বছর (অপর বর্ণনায় এক’শ চল্লিশ বছর)। ইন্তেকালের সময় তাঁরই অনুরোধে মহানবী (দ:)-এর চাচা আবূ তালেব তাঁর অভিভাবক হন। কেননা, তিনি ছিলেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতা আবদুল্লাহ’র আপন ভাই।

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন জালহামা ইবনে উরফাতা হতে; সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান: “আমি এক খরার সময় মক্কায় আবির্ভূত হই। কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন আবূ তালেবের কাছে এসে আরয করেন, ‘হে আবূ তালেব, এই উপত্যকা অনুর্বর এবং সকল পরিবার আর্তপীড়িত। চলুন, আমরা বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করি।’ আবূ তালেব (ঘর থেকে) বেরিয়ে আসেন, আর তাঁর সাথে ছিলেন এক বাচ্চা ছেলে, যাঁকে দেখতে লাগছিল মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের মতো। তাঁর আশপাশে ঘিরে ছিল অন্যান্য শিশুর দল। আবূ তালেব তাঁকে কা’বাগৃহের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন। আকাশে ওই সময় মেঘের কোনো লেশচিহ্ন মাত্র ছিল না। কিন্তু যেমনি ওই বালক তাঁর হাত দুটো ওপরে তোলেন, অমনি সবদিক থেকে মেঘ আসা আরম্ভ করে এবং বৃষ্টিও নামে – প্রথমে অল্প, শেষে অঝোর ধারায়। ফলে উপত্যকা এলাকা উর্বর হয়ে ওঠে, আর মক্কা ও বাইরের মরুভুমি অঞ্চলও শস্যশ্যামলতা ফিরে পায়। এই মো’জেযা (অলৌকিক ঘটনা) সম্পর্কে আবূ তালেব (পদ্যাকারে) লেখেন:

‘জ্যোতির্ময় চেহারার সেই পবিত্র সত্তার সকাশে
যাঁর খাতিরে বারি বর্ষে
তিনি-ই এয়াতীমবর্গের আশ্রয়স্থল সবশেষে
আর বিধবাদের ভরসার উপলক্ষ নিঃশেষে’।”

                                                                  *সমাপ্ত*




বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ২)


একসাথে সকল পর্ব :

http://sunni-encyclopedia.blogspot.com/2015/10/blog-post_15.html?m=1

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ২)
অনুবাদ : কাজী সাইফুদ্দীন হোসাইন



মায়ের গর্ভে প্রিয়নবী (দ:)

আবরাহা’র শ্যেনদৃষ্টি থেকে আল্লাহতা’লা কর্তৃক রক্ষা পাবার পর এক রাতে আবদুল মোত্তালিব কা’বা ঘরের প্রাঙ্গনে ঘুমোবার সময় এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন। তিনি জেগে ওঠে ভয় পান এবং কুরাইশ গোত্রীয় গণকদের কাছে গিয়ে এর বিবরণ দেন। তারা তাঁকে বলে, “এ স্বপ্ন সত্য হলে আপনার ঔরসে এমন কেউ আসবেন যাঁর প্রতি আসমান ও জমিনের বাসিন্দারা বিশ্বাস স্থাপন করবেন এবং যিনি সুপ্রসিদ্ধি লাভ করবেন।” ওই সময় তিনি ফাতেমা নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করেন, যাঁর গর্ভে জন্ম নেন আবদুল্লাহ আল-যাবীহ (রা:), যাঁর ইতিহাসও সর্বজনবিদিত।

অনেক বছর পরে আবদুল্লাহ (রা:) নিজ জীবনরক্ষার সদকাহ-স্বরূপ এক’শটি উট কোরবানি করে তাঁর পিতাসহ যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তাঁরা ফাতেমা নাম্নী এক ইহুদী গণকের সাক্ষাৎ পান। সে কুরাইশ গোত্রের সেরা সুদর্শন যুবক আবদুল্লাহ (রা:)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার জন্যে যতোগুলো উট কোরবানি করা হয়েছে, আমি ততোগুলো উট আপনাকে দেবো; তবে শর্ত হলো এই মুহূর্তে আপনাকে আমার সাথে সহবাস করতে হবে।” তার এ কথা বলার কারণ ছিল সে আবদুল্লাহ (রা:)-এর মুখমণ্ডলে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) দেখতে পেয়েছিল। আর সে এও আশা করেছিল সম্মানিত মহানবী (দ:)-এর মাতা সে-ই হতে পারবে। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা:) জবাব দেন:

হারামের মোকাবেলায় কাম্য কেবল মৃত্যু
আর আমি এতে দেখি না কোনো হালাল বা বৈধত্ব
বরঞ্চ এক্ষণে তোমার দ্বারা যা আমা হতে যাচিত
সম্মানী মানুষের তা হতে নিজ সম্মান ও দ্বীন রাখা চাই সুরক্ষিত।

পরের দিন আবদুল মোত্তালিব নিজ পুত্রকে ওয়াহাব ইবনে আবদ মানাআফের সাথে দেখা করিয়ে দেন; ইনি ছিলেন বনূ যোহরা গোত্রপ্রধান, বংশ ও খানদানে তাদের অধিপতি। আবদুল মোত্তালিব পুত্র আবদুল্লাহ (রা:)-কে ওয়াহাবের কন্যা আমিনা (রা:)-এর সাথে বিয়ে দেন; ওই সময় আমিনা (রা:) ছিলেন কুরাইশ গোত্রে বংশ ও পারিবারিক দিক দিয়ে অন্যতম সেরা মহিলা। অতঃপর মিনা দিবসগুলোর মধ্যে কোনো এক সোমবার আবূ তালিবের গিরিপথে তাঁরা দাম্পত্যজীবনের শুভসূচনা করেন এবং মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন।

তৎপরবর্তী দিবসে আবদুল্লাহ (রা:) ঘরের বাইরে বেরুলে ইতিপূর্বে তাঁর কাছে প্রস্তাবকারিনী সেই মহিলার দেখা পান। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “গতকাল যে প্রস্তাব তুমি আমায় দিয়েছিলে, আজ কেন তা আমায় দিচ্ছ না?” সে প্রত্যুত্তরে বলে, “গতকাল যে জ্যোতি তুমি বহন করেছিলে, তা আজ তোমায় ত্যাগ করেছে। তাই আমার কাছে আজ আর তোমাকে প্রয়োজন নেই। আমি ওই নূর আমার (গর্ভ) মাঝে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খোদাতা’লা তা অন্যত্র রাখার এরাদা করেছেন।”

মহানবী (দ:) তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসার সূচনালগ্ন থেকেই বহু মো’জেযা তথা অলৌকিক বা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটতে থাকে। সাহল ইবনে আবদিল্লাহ আত্ তুসতরী (রহ:) বলেন, “আল্লাহতা’লা যখন রজব মাসের কোনো এক শুক্রবার রাতে মহানবী (দ:)-কে তাঁর মায়ের গর্ভে পয়দা করেন, তখন তিনি বেহেশতের রক্ষক রিদওয়ানকে সর্বসেরা বেহেশতের দ্বার খুলে দিতে আদেশ করেন। কেউ একজন আসমান ও জমিনে ঘোষণা দেন যে অপ্রকাশ্য নূর যা দ্বারা হেদায়াতকারী পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) গঠিত হবেন, তা এই নির্দিষ্ট রাতেই তাঁর মায়ের গর্ভে আসবেন, যেখানে তাঁর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে। আরও ঘোষিত হয় যে তিনি সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী হিসেবে (পৃথিবীতে) আবির্ভূত হবেন।”

কাআব আল-আহবার (রহ:) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসার রাতে আসমানসমূহে এবং জমিনের প্রতিটি প্রান্তে ঘোষণা করা হয় যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে যে অপ্রকাশ্য নূর হতে সৃষ্ট, তা তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসবেন।

উপরন্তু, ওই দিন পৃথিবীর বুকে যতো মূর্তি ছিল সবই মাথা নিচের দিকে এবং পা ওপরের দিকে উল্টো হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খরাপীড়িত ও দুর্দশাগ্রস্ত ছিল; কিন্তু এই মহা আশীর্বাদধন্য ঘটনার বদৌলতে ধরণীতল আবারও শষ্যশ্যামল হয়ে ওঠে এবং বৃক্ষতরু ফলবতী হয়; আর আশীর্বাদ ও কল্যাণ (ওই গোত্রের) চারপাশ থেকে তাদের দিকে ধাবমান হয়। এ সব মঙ্গলময় লক্ষণের জন্যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম যে বছর তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন, সেটিকে ‘বিজয় ও খুশির বছর’ বলা হয়।

ইবনে এসহাক বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:) সবসময়ই উল্লেখ করতেন মহানবী (দ:) তাঁর গর্ভে থাকাকালীন সময়ে ফেরেশতাবৃন্দ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসার কথা; আর তাঁকে বলা হতো, “এই জাতির অধিপতি আপনার গর্ভে অবস্থান করছেন।” তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “আমি কখনোই (মহানবীকে) গর্ভে ধারণ অবস্থায় অনুভব করিনি যে আমি গর্ভবতী। আর আমি অন্যান্য গর্ভবতী নারীদের মতো কোনো অসুবিধা বা খিদেও অনুভব করিনি। আমি শুধু লক্ষ্য করেছি যে আমার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একবার আমি যখন ঘুম আর জাগ্রতাবস্থার মাঝামাঝি ছিলাম, তখন কোনো এক ফেরেশতা এসে আমাকে বলেন,

‘আপনি কি মনুষ্যকুলের অধিপতিকে গর্ভে ধারণ করার অনুভূতি পাচ্ছেন?’ এ কথা বলে তিনি চলে যান। মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আবার এসে আমাকে বলেন: ‘বলুন, আমি তাঁর (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) প্রতি প্রত্যেক বিদ্বেষভাব পোষণকারীর ক্ষতি থেকে তাঁরই সুরক্ষার জন্যে মহান সত্তার মাঝে আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং তাঁর নাম রাখি (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর দ্বারা তাঁরই মায়ের গর্ভে আসার অলৌকিক ঘটনা (মো’জেযা)-গুলোর একটি হচ্ছে এই যে, ওই রাতে কুরাইশ গোত্রের মালিকানাধীন সমস্ত পশুপাখি মুখ খুলে এ কথা বলেছিল, “কা’বাগৃহের প্রভুর দোহাই, রাসূলুল্লাহ (দ:) (তাঁর মায়ের) গর্ভে এসেছেন। তিনি-ই হলেন সারা জাহানের অধিপতি এবং এর অধিবাসীদের জ্যোতি (নূর)। এমন কোনো রাজার সিংহাসন নেই যা আজ রাতে ওলটপালট না হয়ে গিয়েছে।” পূর্বাঞ্চলের তাবৎ পশুপাখি পশ্চিমাঞ্চলের পশুপাখির কাছে এই খোশখবরী নিয়ে ছুটে গিয়েছে; আর অনুরূপভাবে সাগরজলের অধিবাসীরাও একে অপরকে একইভাবে সম্ভাষণ জানিয়েছে। তাঁর গর্ভে আসার মাসের প্রতিদিনই আসমানে এলান (ঘোষণা) দেয়া হয়েছে এবং জমিনেও এলান দেয়া হয়েছে এভাবে: ‘খুশি উদযাপন করো, (কেননা) আশীর্বাদধন্য ও সৌভাগ্যবান আবূল কাসেম আবির্ভূত হবার সময় সন্নিকটে।”

আরেকটি রেওয়ায়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ওই রাতে প্রতিটি ঘরই আলোকিত করা হয়েছিল, আর ওই নূর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল; উপরন্তু, সমস্ত প্রাণিজগত-ও কথা বলেছিল।

আবূ যাকারিয়্যা এয়াহইয়া ইবনে আইস্ বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের গর্ভে পুরো নয় মাস অবস্থান করেছিলেন, আর (ওই সময়) তাঁর মা কখনোই এমন কোনো ব্যথা বা অসুবিধা অনুভব করেননি যা একজন গর্ভধারিনী মা গর্ভকালীন সময়ে অনুভব করে থাকে। তিনি সবসময়ই বলতেন, ‘এই গর্ভের চেয়ে সহজ আর কোনো গর্ভ আমি প্রত্যক্ষ করিনি, এর চেয়ে আশীর্বাদধন্য গর্ভও আমি দেখিনি’।”

আমিনা (রা:)-এর গর্ভকালের দ্বিতীয় মাসে আবদুল্লাহ (রা:) মদীনা মোনাওয়ারায় তাঁরই বনূ নাজ্জার গোত্রীয় চাচাদের উপস্থিতিতে বেসাল (খোদার সাথে পরলোকে মিলন)-প্রাপ্ত হন। তাঁকে আল-আবওয়া’ নামের স্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, “হে আমাদের প্রভু ও মালিক! আপনার রাসূল (দ:) একজন এয়াতিম হয়ে গিয়েছেন।” জবাবে আল্লাহ পাক বলেন, “আমি-ই হলাম তাঁর রক্ষক ও সাহায্যকারী।”

মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে আবির্ভাবে অলৌকিকত্ব

আমর ইবনে কুতায়বা তাঁর জ্ঞানী পিতা (কুতায়বা) থেকে শুনেছেন, তিনি বলেন: “আমিনা (রা:)-এর গর্ভের চূড়ান্ত সময় উপস্থিত হলে আল্লাহতা’লা ফেরেশতাদের আদেশ দেন, ‘আসমানের সব দরজা ও বেহেশতের সব দরজাও খুলে দাও।’ ওই দিন সূর্য তীব্র প্রভা দ্বারা সুসজ্জিত হয়, আর আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর ওয়াস্তে ওই বছর পৃথিবীতে সকল নারীর গর্ভে পুত্র সন্তান মঞ্জুর করেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে আমিনা সবসময় বলতেন, “আমার গর্ভ যখন ছয় মাস, তখন এক ফেরেশতা আমায় স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন: ‘ওহে আমিনা, আপনি বিশ্বজগতের সেরা জনকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তাঁর বেলাদতের সময় আপনি তাঁর নাম রাখবেন (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) এবং সেই নাম (মোবারক) গোপন রাখবেন।’ প্রসব বেদনা অনুভূত হতে শুরু করলে কেউই জানেননি যে আমি ঘরে একা। আবদুল মোত্তালিব-ও জানতে পারেননি, কেননা তিনি ওই সময় কা’বা ঘর তওয়াফ করছিলেন। আমি একটি প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পাই যা আমাকে ভীতিগ্রস্ত করে। অতঃপর লক্ষ্য করতেই মনে হলো একটি সাদা পাখির ডানা আমার হৃদয়ে (মধুর) পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, যার দরুন আমার সমস্ত শংকা উবে যায়; আর আমার অনুভূত সমস্ত (প্রসব) বেদনাও প্রশমিত হয়। আমার সামনে দৃশ্যমান হয় এক সাদা রংয়ের শরবত, যা আমি পান করি। এরপর এক তীব্র জ্যোতি আমার প্রতি নিক্ষেপিত হয় এবং আমি কয়েকজন মহিলা দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত দেখতে পাই। এঁরা তালগাছের সমান লম্বা ছিলেন, আর এঁদেরকে দেখতে লাগছিল আবদ মানাআফ গোত্রের নারীদের মতোই। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবলাম, ‘এঁরা কীভাবে আমার সম্পর্কে জানলেন?’ ওই মহিলাবৃন্দ আমাকে বলেন, ‘আমরা হলাম ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মরিয়ম।’ এদিকে আমার (শারীরিক) অবস্থা আরও তীব্র আকার ধারণ করলে ধুপধাপ আওয়াজও বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় আরও ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় অামি হঠাৎ দেখতে পাই একখানি সাদা রেশমের ফালি আসমান ও জমিনের মাঝে বিছিয়ে দেয়া হয় এবং কেউ একজন বলেন, ‘তাঁকে লুকিয়ে রাখো যাতে মানুষেরা দেখতে না পায়।’ আমি আকাশে রূপার পানি ঢালার ‘জগ’ হাতে নিয়ে মানুষদেরকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। অতঃপর এক ঝাঁক পাখি এসে আমার ঘর ভরে যায়; এগুলোর ঠোঁট ছিল পান্নার, আর ডানা লালমণির। আল্লাহতা’লা এমতাবস্থায় আমার চোখের সামনে থেকে পর্দা উঠিয়ে নেন এবং আমি প্রত্যক্ষ করি সারা পৃথিবীকে, পূর্ব হতে পশ্চিমে, যেখানে তিনটি পতাকা ছিল উড্ডীন: একটি পূর্বদিকে, আরেকটি পশ্চিমদিকে এবং তৃতীয়টি কা’বা গৃহের ওপর। ঠিক সে সময়ই মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়। তিনি ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথেই সেজদায় পড়ে যান এবং আসমানের দিকে হাত তুলে বিনীতভাবে দোয়া করেন। অতঃপর আমি দেখতে পাই আসমানের দিক থেকে একটি সাদা মেঘ এসে তাঁকে ঢেকে ফেলে, যার দরুন তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। একটি কণ্ঠস্বরকে আমি বলতে শুনি, ‘তাঁকে দুনিয়ার সকল প্রান্তে নিয়ে যাও, পূর্ব ও পশ্চিমদিকে, সাগর-মহাসাগরে, যাতে সবাই তাঁকে তাঁর (মোবারক) নামে, বৈশিষ্ট্যে ও আকৃতিতে চিনতে পারে।’ এর পরপরই ওই সাদা মেঘমালা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।”


আল-খতীব আল-বাগদাদী (রহ:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত হওয়ার সময় আমি আধ্যাত্মিকতায় উদ্দীপ্ত আলোকোজ্জ্বল একখানি বড় মেঘ দেখতে পাই, যা’তে অনেকগুলো ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, ডানা ঝাপটানোর এবং মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ শুনি। ওই মেঘ তাঁকে ঢেকে ফেলে এবং তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। অতঃপর আমি একটি কণ্ঠস্বরকে বলতে শুনি, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-কে সারা পৃথিবীতে ঘোরাও। তাঁকে জ্বিন, ইনসান, ফেরেশতা, বন্য পশুপাখির মতো সমস্ত আত্মাবিশিষ্ট সত্তার কাছে প্রদর্শন করো। তাঁকে দাও আদম (আ:)-এর (দৈহিক) আকৃতি; শীষ নবী (আ:)-এর জ্ঞান; নূহ (আ:)-এর সাহস; ইব্রাহীম (আ:)-এর (মতোই খোদার) নৈকট্য; ইসমাঈল (আ:)-এর জিহ্বা; এসহাক (আ:)-এর (অল্পে) তুষ্টি; সালেহ নবী (আ:)-এর বাগ্মিতা; লুত (আ:)-এর প্রজ্ঞা; এয়াকুব (আ:)-এর (কাছে প্রদত্ত) শুভসংবাদ; মূসা (আ:)-এর শক্তি; আইয়ুব নবী (আ:)-এর ধৈর্য; ইউনূস নবী (আ:)-এর তাবেদারী/আনুগত্য; ইউশা বিন নূন (আ:)-এর দ্বন্দ্বসংঘাত মোকাবেলা করার সামর্থ্য; দাউদ (আ:)-এর প্রতি প্রদত্ত সুরক্ষা; দানিয়েল নবী (আ:)-এর (খোদা)-প্রেম; ইলিয়াস নবী (আ:)-এর উচ্চমর্যাদা; এয়াহইয়া (আ:)-এর নিষ্কলঙ্ক অবস্থা; এবং ঈসা (আ:)-এর কৃচ্ছ্বব্রত। অতঃপর তাঁকে অবগাহন করাও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর বৈশিষ্ট্যসমূহের মহাসমুদ্রে।’ এরপর ওই মেঘ সরে যায় এবং সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) একটি সবুজ রেশমের টুকরো হাতে পেঁচিয়ে শক্তভাবে ধরেন; আর তা থেকে অনবরত পানি বেরোচ্ছিল। এমতাবস্থায় কেউ একজন বলেন, ‘উত্তম, উত্তম, মহানবী (দ:) সমগ্র জগতকে মুঠোর মধ্যে নিয়েছেন; জগতের সমস্ত সৃষ্টি-ই তাঁর মুঠোর অভ্যন্তরে রয়েছে, কেউই বাদ পড়েনি।’ এমতাবস্থায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁকে জ্যোৎস্না রাতের পূর্ণচন্দ্রের মতোই (আলোকোজ্জ্বল) দেখাচ্ছিল। তাঁর কাছ থেকে ওই সময় সেরা মেশকের সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। আর এমনই সময় হঠাৎ সেখানে আবির্ভূত হন তিনজন। একজনের হাতে ছিল রুপার নির্মিত পানি ঢালার ‘জগ’; দ্বিতীয়জনের হাতে পান্নার তৈরি কাপড় কাচার বড় কাঠের পাত্র; আর তৃতীয়জনের হাতে ছিল এক টুকরো সাদা রংয়ের রেশমবস্ত্র, যা তিনি মোড়ানো অবস্থা থেকে খোলেন। এরপর তিনি একটি চোখ ধাঁধানো আংটি বের করে তা ওই ‘জগ’ হতে পানি দ্বারা সাতবার ধোন এবং সেই আংটির সাহায্যে মহানবী (দ:)-এর পিঠে (দুই কাঁধের মাঝে) একটি মোহর বা সীল এঁকে দেন। অতঃপর ওই রেশম দ্বারা তিনি তাঁকে মুড়িয়ে নিজ ডানার নিচে বহন করে এনে আমার কাছে ফেরত দেন।” [সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম]

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর যখন বেলাদত হয়, তখন বেহেশতের রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রিদওয়ান তাঁর কানে কানে বলেন, ‘ওহে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম), খুশি উদযাপন করুন। কেননা, অন্যান্য পয়গম্বরের যতো জ্ঞান আছে, তার সবই আপনাকে মঞ্জুর করা হয়েছে। অতএব, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে আপনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সাহসীও’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হলে তাঁর সাথে আবির্ভূত হয় এক জ্যোতি, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে অবস্থিত সমস্ত আকাশ আলোকিত করে। এরপর তিনি মাটিতে নেমে হাতের ওপর ভর দিয়ে এক মুঠো মাটি তুলে নেন এবং শক্তভাবে ধরেন; অতঃপর তিনি আসমানের দিকে তাঁর মস্তক মোবারক উত্তোলন করেন।”


আত্ তাবারানী (রহ:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) যখন মাটিতে নামেন, তখন তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ ছিল এবং তাঁর তর্জনী আল্লাহতা’লার একত্বের সাক্ষ্য দিতে ওপরদিকে ওঠানো ছিল।

উসমান ইবনে আবি-ইল-আস্ বর্ণনা করেন যে তাঁর মাতা ফাতেমা বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদতের সময় আমি দেখতে পাই (আমিনার) ঘর আলোকিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারকারাজি এতো কাছে চলে এসেছিল যে আমি মনে করেছিলাম সেগুলো বুঝি আমার ওপরই পড়ে যাবে।”

আল-এরবায ইবনে সারিয়্যা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমি-ই হলাম আল্লাহতা’লার বান্দা ও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর সীলমোহর; ঠিক সে সময় হতে আমি তা-ই, যখন আদম (আ:)-এর কায়া মাটি ছিল। আমি এই বিষয়টি তোমাদের কাছে ব্যাখ্যা করবো: আমি-ই আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়ার উত্তর (ফসল); আর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত শুভসংবাদ; আর আমার মায়ের দেখা স্বপ্নের বিষয়বস্তু। পয়গম্বরবৃন্দের মায়েরা অহরহ-ই (এ ধরনের) স্বপ্ন দেখে থাকেন।” মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:) তাঁর বেলাদতের সময় এমন এক নূর (জ্যোতি) দেখতে পান যার আলোকোচ্ছ্বটায় সিরিয়ার প্রাসাদগুলোও আলোকিত হয়। হুযূর পূর নূর (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) তাঁর রচিত কবিতায় এই বিষয়টি-ই উল্লেখ করেন এভাবে –

”(হে নবী) আপনার বেলাদত হয়েছিল যবে
ভুবন ও দিগন্ত আলোকিত হয়েছিল আপনারই নূরের বৈভবে
সেই নূরের আলোয় ও ন্যায়ের পথেই চলেছি আমরা সবে।”

ইবনে সাআদ (রহ:) বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:)-এর গর্ভে যখন মহানবী (দ:)-এর বেলাদত হয়, তখন নবজাতকের শরীরে যে প্রসবোত্তর মল থাকে তা তাঁর মধ্যে ছিল না।

সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্দান (শাম-দেশ)-এর প্রাসাদগুলো আলোকিত হওয়ার যে কথা (বর্ণনায়) এসেছে, সে সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহানবী (দ:)-এর নবুওয়্যতের নূর হতে ওই সমস্ত রাজ্য আশীর্বাদধন্য হয়েছে; কেননা, ওগুলো তাঁরই নবুওয়্যতের এলাকাধীন। এ কথা বলা হয়েছে, “ওহে কুরাইশ গোত্র, রেসালাত এখন আর বনী ইসরাঈল বংশের আয়ত্তে নেই। আল্লাহর কসম, মহানবী (দ:) তোমাদেরকে এমন প্রভাব বিস্তারের দিকে পরিচালনা করবেন, যা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হবে।”

মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনকালীন অলৌকিক ঘটনাবলীর কিছু কিছু ইমাম এয়াকূব ইবনে সুফিয়ান নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে নিজ ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন যে পারস্যরাজ কিসরা (খসরু)-এর প্রাসাদ ওই সময় কেঁপে উঠেছিল এবং সেটির চৌদ্দটি ঝুল-বারান্দা ভেঙ্গে পড়েছিল; তাইবেরিয়াস হৃদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল; পারস্যের আগুন নিভে গিয়েছিল (যা অসংখ্য বর্ণনামতে এক হাজার বছর যাবত অবিরাম জ্বলেছিল); আর আসমানে প্রহরী ও ধুমকেতুর সংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শয়তানের দলের আড়ি পাতার বদমাইশিকে প্রতিরোধ করা হয়েছিল।

হযরত ইবনে উমর (রা:) ও অন্যান্যদের বর্ণনানুযায়ী, হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বেলাদত খতনা অবস্থায় হয় এবং তাঁর নাড়িও ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গিয়েছিল। হযরত আনাস (রা:) উদ্ধৃত করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমার মহান প্রভু কর্তৃক আমার প্রতি মঞ্জুরিকৃত উচ্চমর্যাদার একটি হলো, আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) খতনা অবস্থায় হয়েছে এবং কেউই আমার গোপন অঙ্গ দেখেনি।”

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের বছর সম্পর্কে (ঐতিহাসিকদের) বিভিন্ন মত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মত হচ্ছে তিনি ’হস্তীর বছর’ ধরণীতে আগমন করেন। সেটি ছিল আবরাহা বাদশাহ’র হস্তী বাহিনীর ঘটনার পঞ্চাশ দিন পরে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখের ভোরে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত সোমবার হয়; রেসালাতের দায়িত্বও সোমবার তাঁর প্রতি ন্যস্ত হয়; মক্কা মোয়াযযমা থেকে মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত-ও করেন সোমবার; মদীনায় আগমনও করেন সোমবার; আর কালো পাথর বহনও করেন সোমবার। উপরন্তু, মক্কা বিজয় ও সূরা আল-মায়েদা অবতীর্ণ হবার উভয় দিন-ই ছিল সোমবার।”


আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আল-আস্ (রহ:) বর্ণনা করেন, “সিরিয়াবাসীদের এক পুরোহিত বসবাস করতেন মারর্ আল-যাহরান এলাকায়, যাঁর নাম ছিল ইয়াসা। তিনি সবসময় বলতেন, ‘মক্কায় এক নবজাতক শিশুর আবির্ভাবের সময় হয়ে এসেছে, যাঁর কাছে আরব জাতি সমর্পিত হবে; আর অনারব জাতিগোষ্ঠীও যাঁর কর্তৃত্বাধীন হবে। এটি-ই তাঁর (নবুওয়্যতের) জমানা।’ কোনো নবজাতকের জন্মের খবর পেলেই ওই পুরোহিত তার খোঁজখবর নিতেন। সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরণীতে শুভাগমন) দিবসে আবদুল মোত্তালিব ঘর থেকে বেরিয়ে পুরোহিত ইয়াসা’র সাথে দেখা করতে যান। তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে বলেন, ‘আপনাকে যে নবজাতকের ব্যাপারে বলেছিলাম, আপনি যেন তাঁর আশীর্বাদধন্য পিতামহ হোন। আমি বলেছিলাম, তাঁর বেলাদত হবে সোমবার, নবুওয়্যত পাবেন সোমবার, বেসাল (পরলোকে খোদার সাথে মিলন)-প্রাপ্তিও হবে সোমবার।’ আবদুল মোত্তালিব জবাবে বলেন, ‘এই রাতে, ভোরে আমার (ঘরে) এক নবজাতক আবির্ভূত হয়েছেন।’ পুরোহিত জিজ্ঞেস করেন, ‘তাঁর নাম কী রেখেছেন?’ তিনি উত্তর দেন, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)।’ ইয়াসা বলেন, ‘এই নবজাতক আপনার আত্মীয়ের (বংশের) মধ্যে আবির্ভূত হবেন বলেই আমি আশা করেছিলাম। আমার কাছে এর তিনটি আলামত ছিল: তাঁর তারকা (রাশি) গতকাল উদিত হয়; তাঁর বেলাদত হয় আজ; এবং তাঁর নাম (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।” সৌর বছরের সেই দিনটি ছিল ২০শে এপ্রিল এবং বর্ণিত আছে যে তাঁর বেলাদত হয়েছিল রাতে।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর বেলাদত যে রাতে হয়েছিল, ঠিক ওই সময় একজন ইহুদী বণিক মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থান করছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে কুরাইশ গোত্র! আজ কি আপনাদের কোনো নবজাতকের আবির্ভাব হয়েছে?’ তাঁরা উত্তর দেন, ‘আমরা জানি না।’ তিনি তখন তাঁদেরকে বলেন, ‘আজ রাতে সর্বশেষ উম্মতের পয়গম্বরের বেলাদত হবে। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে ঘোড়ার (ঘাড়ে) কেশের মতো কিছু কেশসম্বলিত একটি চিহ্ন থাকবে।’ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ওই ইহুদীকে সাথে নিয়ে আমিনা (রা:)-এর কাছে যান এবং তাঁর পুত্রকে দেখা যাবে কি না তা তাঁর কাছে জানতে চান। তিনি তাঁদের সামনে নিজ নবজাতক পুত্রকে নিয়ে আসেন এবং তাঁরা তাঁর পৃষ্ঠদেশ হতে কাপড় সরালে সেই চিহ্নটি দৃশ্যমান হয়। এতে ওই ইহুদী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার জন্যে আফসোস! আপনার আবার কী হলো?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আল্লাহর কসম! বনী ইসরাঈল বংশ হতে নবুওয়্যত অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে’।”

আল-হাকীম (নিশাপুরী) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা মোকাররমা’র মোহাম্মদ বিন ইউসূফের ঘরে আবির্ভূত হন। তাঁর দুধ-মায়ের নাম সোয়াইবিয়া, যিনি ছিলেন আবূ লাহাবের বাঁদি এবং যাঁকে হুযূর পাক (দ:)-এর বেলাদতের খোশ-খবরী নিয়ে আসার জন্যে তাঁর মনিব (আবূ লাহাব) মুক্ত করে দিয়েছিল। আবূ লাহাবের মৃত্যুর পরে তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তুমি এখন কেমন আছো?’ সে জবাব দেয়, ‘আমি দোযখে (নরকে) আছি। তবে প্রতি সোমবার আমাকে রেহাই দেয়া হয়; সেদিন আমি আমার এই আঙ্গুলগুলো হতে পানি পান করতে পারি।’ এ কথা বলার সময় সে তার দুটো আঙ্গুলের ডগা দেখায়। সে আরও বলে, ‘এই মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) এ কারণে যে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ নিয়ে আসার জন্যে আমি আমার দাসী সোয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম।’

ইবনে আল-জাযেরী বলেন, “অবিশ্বাসী আবূ লাহাব, যাকে আল-কুরআনে ভর্ৎসনা (লা’নত) করা হয়েছে, তাকে যদি মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের খুশি উদযাপনের কারণে পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর উম্মতের মধ্যে সেসব মুসলমানের কী শান হবে, যাঁরা তাঁর বেলাদতে খুশি উদযাপন করেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ সর্বাত্মক উদ্যোগ নেন? আমার জীবনের কসম, মহা করুণাশীল আল্লাহতা’লার তরফ থেকে তাঁদের পুরস্কার হলো আশীর্বাদধন্য বেহেশতে প্রবেশাধিকার, যেখানে (তাঁদের জন্যে) অপেক্ষারত মহান প্রভুর অশেষ রহমত, বরকত ও নেয়ামত।”






বিপদে আপদের সময় যেসব দোয়া পড়বেনঃ

বিপদ-মসিবতে পাঠ করার জন্য কতিপয় দোয়া  এবং এর জন্য আমল: ♦১) উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও...