Showing posts with label সালাত সম্পর্কিত. Show all posts
Showing posts with label সালাত সম্পর্কিত. Show all posts

Monday, August 31, 2015

বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে সহিহ কোনো হাদিস আছে কি?



উত্তর :

নামাযে মুসল্লি বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে সহিহ, সরীহ ও মুত্তাফাক আলাইহি কোনো ধরণের হাদিস উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্প্রতি কতিপয় গায়রে মুকাল্লিদ ও লা-মাযহাবীদের ভুল ব্যাখ্যার কারণে স্বাধারণ মুসল্লিগণ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছেন।



১ হাদিস রয়েছে যা ওয়ায়েল বিন হুজুর (রা) থেকে বর্নিত কিন্তু ইহা সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। কেননা হাদিসটির একটি সনদে একজন রাবী হলেন মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল।
তিনি প্রখ্যাত ছিকাহ রাবী ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) থেকেই উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু হাদিসটি আরো আটটি (৮) সনদে বর্ণিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। যার সবগুলোই ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। অথচ আটটি সনদের কোনো একটিতেও علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকু পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল এর বর্ণিত হাদিসেই علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকু পাওয়া যায়, যিনি منكر الحديث তথা হাদিসের জগতে পরিত্যাজ্য। তাই ধারণা করা যাচ্ছে যে, “বুকের উপর” অংশটুকু তারই বৃদ্ধিকৃত। ফলে তা বাতিল। মজার ব্যাপার হল, ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) নিজেও علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকুর উপর আমল করতেন না। তাহলে সেটি কিভাবে তাঁর থেকে علي صدره (বুকের উপর)— অংশটুকু সহকারে বর্ণিত হতে পারে!


হাদিসটির সনদ এরকম :



হাদিসের সংকলক তিনি আবু তাহের থেকে তিনি আবু বকর থেকে তিনি আবু মূসা থেকে তিনি মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল থেকে তিনি হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) থেকে তিনি আছিম ইবনে কুলাইব থেকে তিনি স্বীয় পিতা থেকে তিনি সাহাবী হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।

– ﺃﺧﺒﺮﻧﺎ ﺃﺑﻮ ﻃﺎﻫﺮ ، ﻧﺎ ﺃﺑﻮ ﺑﻜﺮ ، ﻧﺎ ﺃﺑﻮ ﻣﻮﺳﻰ ، ﻧﺎ ﻣﺆﻣﻞ ، ﻧﺎ ﺳﻔﻴﺎﻥ ، ﻋﻦ ﻋﺎﺻﻢ ﺑﻦ ﻛﻠﻴﺐ ، ﻋﻦ ﺃﺑﻴﻪ ، ﻋﻦ ﻭﺍﺋﻞ ﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﻗﺎﻝ : ” ﺻﻠﻴﺖ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ، ﻭﻭﺿﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻋﻠﻰ ﺻﺪﺭﻩ

অর্থাৎ আমি আল্লাহ’র রাসুল (সাঃ)-এর সাথে নামায পড়েছিলাম। তিনি (নামাযে) তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের উপর রাখলেন।

(সহিহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২ , হাদিস নং ৪৭৯)।

Note :

প্রথমত : রাবী মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইলের সূত্রে উক্ত বর্ণনাটি সঠিক নয়। কেননা হাদিসশাস্ত্রের নীতিমালা অনুসারে এ বর্ণনায় (বুকের ওপর) কথাটা মুনকার । অর্থাৎ সুফিয়ান সাওরী (রহঃ)-থেকে অপরাপর আটটি বর্ণনায় علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকুর উল্লেখ পাওয়া যায়না। সম্ভবত মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল ভুলক্রমে তা বৃদ্ধি করে দেন।

কেননা মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল এর উস্তাদ হলেন ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহঃ)। যাঁর কাছ থেকে হাদিসটি মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ফিরয়াবী এবং আবদুল্লাহ ইবনে ওয়ালীদ (রহঃ) সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন। যাদের সবাই ছিকাহ (বিশ্বস্ত) ও শক্তিশালী রাবী । কিন্তু তাদের কারোর রেওয়ায়েতে علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকুর উল্লেখ পাওয়া যায়না।

(দেখুনঃ মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮, আল-মুজামুল কাবীর তিবরানী ২২/৩৩)।

মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল সম্পর্কে জারহ তা’দীলের ইমামদের সিদ্ধান্ত :

আগেই বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল এর বর্ণিত হাদিসেই علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকু পাওয়া যায়, যিনি منكر الحديث তথা হাদিসের জগতে পরিত্যাজ্য। ইমাম বুখারী, ইমাম যাহাবী এবং ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (আলাইহিমুর রাহমাহ) তাকে منكر الحديث তথা হাদিসের জগতে পরিত্যাজ্য বলে উল্লেখ করেছেন।

(দেখুনঃ তাহযীবুল কামাল- ১৮/৫২৬, তাহযীবুত তাহযীব- ১০/৩৪০, মীযানুল- ইতিদাল ৮৯৪৯, আল-মুগনী ফি দ্বু’আফা- ৬৫৪৭)।

তার সম্পর্কে ইমাম আল্লামা মুরূযী (রহ) বলেছেন :

و قال محمد ابن نصر المروزي المؤمل إذا انفرد بحديث وجب ان يتوقف و يثبت فيه لأنه كان سيئ الحفظ كثير الغلط . ميزان الاعتدال ، تهذيب التهذيب : ٢٧٢

অর্থাৎ মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল তিনি যখন কোনো হাদিস একাকী বর্ণনা করবে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। কেননা তার স্মরণ শক্তি দুর্বল ছিল এবং অনেক ভুলও করতেন বেশি। ”
( সূত্র— মীযানুল ইতিদাল, তাহযীবুত তাহযীব ২৭২)।

আশ্চর্যের বিষয় হল, লামাযহাবীদের শায়খ নাসীরুদ্দিন আলবানী তিনিও তার সিলসিলাতু আদ-দ্বয়ীফা’র কিতাবে অনক জায়গায় তাকে দ্বয়ীফ (দুর্বল) বলেছেন এবং তার সম্পর্কে ইমামগনের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন ।
(দেখুনঃ সিলসিলাতু আদ-দ্বয়ীফা- ১/১৩১ , ২/২৪৬ , ৩/১৭৯, ৩/২২৭, ৪/৪৫৫ ইত্যাদি ।)

দ্বিতীয়তঃ হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) তিনি হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রাঃ)-এর রেওয়ায়তটি হযরত আছিম ইবনে কুলাইব থেকে বর্ণনা করেছেন ।


আছিম ইবনে কুলাইব থেকে এ হাদিস আরো যাঁরা বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন-

১- বিশিষ্ট রাবী ইমাম শোবা ইবনুল হাজ্জাজ,
২- হযরত বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল,
৩- হযরত কায়স ইবনুর রাবী,
৪- হযরত যাইদা ইবনে কুদামা,
৫- হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ,
৬- হযরত খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ ,
৭- হযরত আবু ইসহাক,
৮- হযরত আবুল আহওয়াস,
৯- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস ,
১০- হযরত মুসা ইবনে আবী আয়েশা ,
১১- হযরত আবু আওয়ানা প্রমুখ। তাঁরা প্রত্যেকে হাদিসের বিখ্যাত ইমাম এবং ছিকাহ রাবী।

প্রত্যেকে আছিম ইবনে কুলাইব (রহ) থেকে নামাযে হাত বাঁধার হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু উনাদের কেউ علي صدره (বুকের উপর) কথাটুকু উল্লেখ করেননি।
এদের রেওয়াতগুলোর জন্য নিচের তথ্যগুচ্ছ দেখা যেতে পারে।

যেমন,

মুসনাদে আহমদ- ৪/৩১৯, হাদিস নং ১৮৮৭৮;

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭২৬;

সূনানে নাসায়ী, কুবরা , হাদিস ১১৮৯;

মুজতাবা, হাদিস নং ১২৬৫;

মুসনাদে বাযযার আল-বাহরুয যাখখার, হাদিস নং ৪৪৮৫;

আল-মু’জামুল কাবীর তিবরানী ২২/৩৭;

আল-মুজামুল কাবীর, তিবরানী ২২/৩৩;

মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮;

আল-মুজামুল কাবীর ২২/৩৫;

মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৬;

সুনানে কুবরা বায়হাকী ২/১৩১;

আল-মুজামুল আওসাত তিবরান ২/৪২৩;

মুসনাদে আবু দাউদ ত্বায়ালিসী ২/৩৫৮, হাদিস নং ১১১৩

আল-মুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/৩৪;

সহীহ ইবনে হিববান ৫/২৭১;

মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ ৩/৩১৭;

মুসনাদে বাযযার আল-বাহরুয যাখখার, হাদিস নং , ৪৪৮৯;

মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার বায়হাকী ৩/৫০।




~
সুতরাং দীর্ঘালোনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে , আছিম ইবনে কুলাইব থেকে বুকের উপর হাত বাঁধার কথাটুকুর উল্লেখ নেই।

শুধুমাত্র মুয়াম্মল ইবনে ইসমাইল এর বর্ণিত হাদিসেই ﻋﻠﻲ ﺻﺪﺭﻩ (বুকের উপর) কথাটুকু পাওয়া যায়, যিনি ﻣﻨﻜﺮ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ তথা হাদিসের জগতে পরিত্যাজ্য। তাই ধারণা করা যাচ্ছে যে, “বুকের উপর” অংশটুকু তারই বৃদ্ধিকৃত। ফলে তা মুনকার ও বাতিল । যেজন্য লা-মাযহাবীরা “সহিহ ইবনে খোজাইমা” কিতাবের (হাদিস নং ৪৭৯) উদ্ধৃতি দিয়ে নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে যে হাদিসটি প্রদর্শন করে থাকেন সেটি অাদৌ আমলযোগ্য নয়।



Saturday, August 15, 2015

সালাতে হাত কোথায় বাধব? (পর্ব ২)



ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর "হাত বাধা" সম্পর্কিত হাদীসটির বিভিন্ন সুত্র নিম্নরুপ, কিন্তু এগুলোরে ""বুকের উপর হাত রাখার"" বর্ননাটি সম্পুর্ন অনুপস্থিত :



সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শাইখ মুকবিল ইবন হাদী আল-ওয়াদায়ীর উপস্থাপনায় শাইখ খালীদ ইবন আব্দুল্লাহ আশ-শায়ি’ ‘আল-ইলাম বি তাখয়ীরিল মুসাল্লী বিমকানি ওয়াদয়িল ইয়াদাইনি বা’দা তাকবীরাতিল ইহরাম’(তাকবীর তাহরীমার পরে হস্তদ্বয়ের অবস্থান মুসল্লীর ইচ্ছাধীন হওয়া অবগতকরন) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের গবেষণায় ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসটির বিভিন্ন সুত্র নিম্নরুপঃ

(১) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) আব্দুস সামাদ, যায়েদা থেকে।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) ইউনূস ইবন মুহাম্মাদ, আব্দুল ওয়াহিদ থেকে।
(৩) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) আব্দুল্লাহ ইবন ওয়ালীদ, সুফিয়ান থেকে।
(৪) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) আসওয়াদ ইবন আমির, যুহাইর থেকে।
(৫) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৯) আসওয়াদ ইবন আমির, শু’বা থেকে।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (৭২৬ নং) মুসাদ্দাদ, বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল থেকে।
(৭) সুনানে আবু দাউদ (৭২৭ নং) হাসান ইবন আলী, আবুল ওয়ালীদ, যায়েদা থেকে।
(৮) সুনানে ইবন মাজাহ (৮১০ নং) আলী ইবন মুহাম্মাদ, আব্দুল্লাহ ইবন ইদরীস ও বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল থেকে।
(৯) সুনানে নাসাঈ (৮৮৯ নং) সুওয়াইদ ইবন নাসর, ইবনুল মুবারাক, যায়েদা থেকে।
(১০) সহীহ ইবন খুযাইমা (৪৭৭ নং) আব্দুল্লাহ ইবন সাঈদ, ইবন ইদরীস থেকে।
(১১) সহীহ ইবন খুযাইমা (৪৭৮ নং) হারুন ইবন ইসহাক, ইবন ফুদাইল থেকে।

উপরের ১১টি সনদে হাদীসটি(ওয়ায়িল ইবন হুজরের হাদীস) বর্ণিত হয়েছে আসিম ইবন কুলাইব থেকে, তার পিতা থেকে, ওয়ায়িল ইবন হুজর থেকে। এগুলোতে যায়েদাহ, সুফিয়ান, শু’বা, আব্দুল ওয়াহিদ, ইবন ইদরীস কূফী, বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল, যুহাইর ইবন মুআবিয়া, ইবন ফুদাইলঃ এ আট জন নির্ভরযোগ্য রাবী হাদীসটি আসিম ইবন কুলাইব থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা বা ধরার কথা বলেছেন কিন্তু ★★★ কেউই ‘বুকের উপর’ কথাটি বলেন নি।

(১২) সহীহ মুসলিম (১/৩০১) যুহাইর, আফফান, হাম্মাম, মুহাম্মাদ ইবন জুহাদাহ থেকে
(১৩) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৬) ওকী, মাসঊদী, আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল, পরিবারের লোকজন থেকে ওয়ায়িল থেকে
(১৪) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৭) আফফান, হাম্মাম, মুহাম্মাদ ইবন জুহাদাহ, আব্দুল জাব্বার, আলকামা ও মাওলা থেকে ওয়ায়িল থেকে
(১৫) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) ইয়াহইয়া ইবন আবী বুকাইর, যুহাইর, আবূ ইসহাক, আব্দুল জাব্বার থেকে উপরের সনদে
(১৬) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৮) হাসান ইবন মূসা, যুহাইর, আবূ ইসহাক, আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল থেকে …
(১৭) সুনানে দারিমী (১/২৮৩) আবূ নুআইম, যুহাইর, আবূ ইসহাক আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল থেকে …
(১৮) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৬) মুহাম্মাদ ইবন জা’ফার, শু’বা, সালামাহ ইবন কুহাইল, হাজর ইবন আবিল আনবাস, আলকামা থেকে …
(১৯) মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৬) ওকী, মূসা ইবন উমাইর, আলকামা থেকে …।

★★★ এদের কারো বর্ণনাতেই ‘বুকের উপর’ কথাটি নেই।

অর্থাৎ, সুফিয়ান সাওরী, আব্দুল ওয়াহীদ ইবন যিয়াদ, শু’বা, যুহাইর, যায়েদা ইবন কুদামা, বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল, আব্দুল্লাহ ইবন ইদরীস ও মুহাম্মাদ ইবনুল ফুদাইলঃ আট জন আসিম ইবন কুলাইবের সুত্রে বর্ণনা করেছেন। আর মুহাম্মাদ ইবন জুহাদাহ, আবূ ইসহাক ও মাসঊদীঃ তিন জন আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেছেন। আর হাজর ইবন আবিল আনবাস ও মুসা ইবন উমাইর দুজন আলকামা থেকে বর্ণনা করেছেন।

★ মোট ১৩ জন রাবী (তাদের অধিকাংশই প্রসিদ্ধ হাদীসের ইমাম) তারা কেউ ‘বুকের উপর’ কথাটি উল্লেখ করেন নি।
★ শুধু মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল এর বর্ণনাতেই ‘বুকের উপর’ কথাটি রয়েছে। মুআম্মাল দুর্বল হওয়ার কারনে তার হাদীস দুর্বল। উপরন্তু সকল নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীত বর্ণনা হওয়ার কারনে তা ‘মুনকার’ অর্থাৎ, অত্যন্ত দুর্বল বা আপত্তিকর।

★ ইরাকের প্রসিদ্ধ হাদীস গবেষক ড. মাহির ইয়াসীন বলেন যে, মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল এ হাদীসটি(আলোচ্য ‘খ’ নং হাদীসটি) ইমাম সুফিয়ান সাওরী থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ সুফিয়ান সাওরী সালাতে হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখতে বলেছেন। এতে প্রমান হয় যে, ‘বুকের উপর’ কথাটি সুফিয়ান সাওরী বর্ণনা করেন নি; বরং মুআম্মাল ভুলে কথাটি সংযোজন করেছেন। কারন সুফিয়ান বর্ণিত হাদীসে ‘বুকের উপর’ কথাটি থাকলে তিনি তার বিপরীতে মত প্রকাশ করতেন না।[42]


অর্থাৎ, ইবন খুযাইমাতে বর্ণিত উপরোক্ত ‘বুকে’ হাত বাধার হাদীস অত্যন্ত দুর্বল, যা মোটেও দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।



(গ) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেনঃ

“আমাদেরকে ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ বলেন, তিনি সুফিয়ান থেকে, তিনি বলেন, আমাদেরকে সিমাক ইবন হারব বলেন, তিনি কাবীসাহ ইবন হুলব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি বলেন, আমি নাবীউল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখলাম…, তিনি এটিকে(হস্তদ্বয়কে) বুকের উপর রাখলেন। ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ ব্যাখ্যা করে দেখানঃ ডান হাতকে বাম হাতের উপর, কব্জির উপর।”[43]

উপরোক্ত হাদীসের সমস্যা মূলত তিনটি, যথাঃ

(১) হাদীসের সনদে থাকা একজন রাবী ‘কাবীসাহ ইবন হুলব’ অজ্ঞাত পরিচয়।
(২) হাদীসটি ‘শাযয’ [44]।
(৩) হাদীসটি মুদাল্লাস।

হাদীসটির প্রথম সমস্যা হলো ‘কাবীসাহ ইবন হুলব’। সিমাক ছাড়া কেউ তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন নি, আর ইমাম ইবনুল মাদীনী এবং ইমাম নাসায়ী ‘কাবীসাহ ইবন হুলব’কে ‘মাজহূল’ বা অজ্ঞাত পরিচয়[45] বলেছেন। হাফিয ইবন হাজার তাকবীরে তাকে ‘মাকবূল’ বলেছেন।
হাদীসটির দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে হাদীসটি ‘শাযয’। মুহাদ্দিসগন একমত যে, ‘শাযয’ হাদীস অত্যন্ত দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য। উপরোক্ত হাদীসের এক বর্ণনায়[46] ‘বুকের উপর’ কথাটি নেই আর উপরোক্ত বর্ণনায় তা আছে। শাইখ মুকবিল এবং শাইখ খালিদ ‘আল-ই’লাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছন যে, হাদীসটির উপরোক্ত বর্ণনাটি ‘শাযয’। কারন এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইয়াহইয়া আল-কাত্তান সুফিয়ান থেকে, সিমাক থেকে কাবীসাহ থেকে…। এ বর্ণনায় ‘বুকের উপর রাখলেন’ কথাটি রয়েছে। এ হাদীসটি ইয়াহইয়া ছাড়াও নিম্নের কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ‘সুফিয়ান সাওরী’ থেকে বর্ণনা করেছেনঃ

(১) ওয়াকী ইবনুল জাররাহ(মৃঃ ১৯৬ হিজরী), তিনি ইলমুল হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম ও হাফিযুল হাদীস। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল তার মুসনাদে(৫/২৬৬) হাদীসটি আবূ বকর ইবন আবী শাইবা থেকে, ওয়াকী থেকে সুফিয়ান থেকে … সংকলন করেছেন।

(২) আব্দুর রহমান ইবন মাহদী(মৃঃ ১৯৮ হিজরী), তিনি ইলমুল হাদীসের প্রসিদ্ধতম ইমাম ও হাফিযুল হাদীস। দারাকুতনী তার সুনান গ্রন্থে(১/২৮৫) হাদীসটি আব্দুর রহমান ইবন মাহদী থেকে সুফিয়ান থেকে সংকলন করেছেন।

(৩) আব্দুর রাযযাক ইবন হাম্মাম সানআনী (মৃঃ ২১১ হিজরী), তিনি ইলমুল হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম ও হাফিযুল হাদীস। তিনি তার মুসান্নাফ গ্রন্থে(১/২৮৫) সুফিয়ান সাওরী থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

(৪) হুসাইন ইবন হাফস ইবনুল ফাদল হামদানী (মৃঃ ২১০ হিজরী), তিনি ইসপাহানের প্রসিদ্ধ কাযী ও মুফতী ছিলেন। ইমাম মুসলিম তার বর্ণনা গ্রহন করেছেন। ইবন হাজার আসকালানী তাকে ‘সত্যপরায়ণ’ বলেছেন। বাইহাকী তার সুনান গ্রন্থে(২/২৯৫) হুসাইন ইবন হাফস ইবনুল ফাদল হামদানী থেকে সুফিয়ান সাওরী থেকে… হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

(৫) মুহাম্মাদ ইবন কাসীর আল-আবদী (মৃঃ ২৩৩ হিজরী), তিনি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম স্বীকৃত সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য রাবী। ইবন কানি ‘‘মু’জামুস সাহাবা’ গ্রন্থে(৫/১৬৩) এবং আবূ নুআইম ইসপাহানী ‘‘মা’রিফাতুস সাহাবা’ গ্রন্থে(৫/১৬৩) মুহাম্মাদ ইবন কাসীর আল-আবদী থেকে সুফিয়ান সাওরী থেকে হাদীসটি সংকলন করেছেন।

★ তারা কেউই ‘বুকের উপর রাখলেন’- এই অতিরিক্ত কথাটুকু বর্ণনা করেন নি। শুধু তাই নয়; ইয়াহয়া এবং উপরের সকল রাবীর উস্তাদ সুফিয়ান সাওরী ছাড়া অন্যান্য যে সকল রাবী এ হাদীসটি সিমাক ইবন হারব থেকে বর্ণনা করেছেন তারাও এই অতিরিক্ত কথাটুকু(‘বুকের উপর রাখলেন’ কথাটি) বলেন নিঃ


(১) শারীক, সিমাক থেকেঃ মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৬
(২) শু’বা, সিমাক থেকেঃ মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৬, সুনানে আবু দাউদ ১/২৭৩
(৩) আবুল আহওয়াস, সিমাক থেকেঃ মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৬
(৪) যায়েদা, সিমাক থেকেঃ মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৭
(৫) আবসাত ইবন নাসর, সিমাক থেকেঃ তাবারানী, কাবীর ২২/১৬৪
(৬) হাফস ইবন জামী, সিমাক থেকেঃ তাবারানী, কাবীর ২২/১৬৫
(৭) যাকারিয়া ইবন আবী যায়েদা, সিমাক থেকেঃ তাবারানী, কাবীর ২২/১৬৭
(৮) ইসরাঈল, সিমাক থেকেঃ ইবন কানি, মু’জামুস সাহাবাহ ৩/১৯৮
(৯) কাইস ইবন রাবী, সিমাক থেকেঃ ইবন কানি, মু’জামুস সাহাবাহ ৩/১৯৯

★ এরা সকলেই(উপরের ৯ জন) সিমাক থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কিন্তু তাদের কেউই ‘বুকের উপর’ কথাটি বর্ণনা করেন নি। এতে প্রমান হয় যে, এ হাদীসে ‘বুকের উপর রাখলেন’ কথাটি সিমাক বলেন নি।
তার নয় জন ছাত্রের কেউই তা(‘বুকের উপর রাখলেন’ কথাটি) বর্ণনা করেন নি।

★ দশম ছাত্র সুফিয়ান সাওরীর কোনো ছাত্রই তা বলেন নি।

★ শুধু ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ তা বলেছেন।

→ ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তান (মৃঃ ১৯৮ হিজরী), :

তিনি ইলমুল হাদীসের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম। তবে তিনি এ হাদীসটির বর্ণনায়

* ইমাম ওয়াকী,
* ইবন মাহদী,
* ইমাম আব্দুর রাযযাক ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইমাম ও নির্ভরযোগ্য রাবীদের বিপরীত বর্ণনা করেছেন; ফলে তার বর্ণনাটি ‘শাযয’ বলে গণ্য।

★ সর্বোপরি ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরীর সুত্রে বললেন; অথচ আমরা দেখেছি যে, সুফিয়ান সাওরীর মত ছিল সালাতে নাভীর নিচে হাত রাখা।



এতে প্রমান হয় যে, ‘বুকের উপর’ কথাটি সুফিয়ান সাওরীর বর্ণনায় ছিল না; ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ ভুল করে তা সংযোজন করেছেন।


শাইখ মুকবিল এবং শাইখ ওয়ালিদের মতে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল এ কারনের এ হাদীস গ্রহন করেন নি। তিনি(ইমাম আহমাদ) নিজেই হাদীসটি সংকলন করেছেন(তার মুসনাদ গ্রন্থে), তা সত্ত্বেও তিনি নিজেই সালাতে হস্তদ্বয় বুকে রাখা মাকরুহ বলে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন।

প্রসিদ্ধ হাম্বলী ফকীহ মুহাম্মাদ ইবন মুফলিহ (মৃঃ ৭৬৩ হিজরী) বলেনঃ

“হস্তদ্বয় বুকের উপর রাখা মাকরুহ। তিনি(ইমাম আহমাদ) সুস্পষ্টভাবে এ কথা বলেছেন, যদিও আহমাদ নিজেই এ হাদীস সংকলন করেছেন।”[47]

ইমাম আবু দাউদ ইমাম আহমাদের বিভিন্ন ফিকহী মত নিজে তার কাছ থেকে শুনে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন। উক্ত গ্রন্থে বুকে হাত রাখা সম্পর্কে ইমাম আহমাদের মত প্রসঙ্গে ইমাম আবু দাউদ বলেনঃ

“আমি তাকে(ইমাম আহমাদ) বলতে শুনেছি, হস্তদ্বয় বুকের নিকট রাখা মাকরুহ[48]।”[49]

★ হাদীসটির তৃতীয় সমস্যা হচ্ছে হাদীসটি ‘তাদলীস’। তাদলীস-কারী (মুদাল্লিস) রাবী তার কোনো উস্তাদের হাদীস সরাসরি তার থেকে না শুনে তার কোনো দুর্বল ছাত্রের মাধ্যমে শুনলে ছাত্রের নাম উল্লেখ না করে তার উস্তাদের নাম উল্লেখ করেন। এজন্য মুদাল্লিস রাবী ‘আমি নিজে শুনেছি’ না বললে তার হাদীস দুর্বল বলে গণ্য। কাবীসাহ ‘মুদাল্লিস’ রাবী। তিনি তার পিতা থেকে হাদীসটি শুনেছেন বলে জানান নি, শুধু বলেছেনঃ “পিতা থেকে”। এজন্য হাদীসটি ‘মুদাল্লাস’। শাইখ খালিদ শায়ি বলেন, এ অতিরিক্ত কথাটুকুর(‘বুকের উপর রাখলেন’) কারনের ইমাম তিরমিযী এটিকে গ্রহন করেন নি। তিনি(ইমাম তিরমিযী) কাবীসার যেই বর্ণনাটি ‘হাসান’ বলেছেন সেটিতে এ অতিরিক্ত কথা নেই। কাজেই তিরমিযীর বর্ণনাকে হাসান বলার কারনে এ বর্ণনাকে(‘বুকের উপর রাখলেন’ কথা যুক্ত বর্ণনাকে) হাসান বলার সুযোগ নেই। শাইখ খালিদ শায়ি বলেনঃ
“আল্লামা আলবানী(শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী)(রাহিমাহুল্লাহ) সিফাতুস সালাত (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামায) গ্রন্থে বলেছেনঃ ‘তিরমিযী কাবীসা বর্ণিত কোনো কোনো সনদকে হাসান বলেছেন।’ আল্লামা আলবানীর(রাহিমাহুল্লাহ) এ কথাটি সঠিক নয়, বরং এটি তার অসতর্কতা। কারন ‘বুকের উপর’- এ অতিরিক্ত কথাটুকু যে বর্ণনায় নেই তিরমিযী(রাহিমাহুল্লাহ) শুধু সে বর্ণনাকেই হাসান বলেছেন। অতিরিক্ত কথাটুকু-সহ বর্ণনাটি তিরমিযী গ্রহন করেন নি। কাজেই তিরমিযীর মত দ্বারা এ অতিরিক্ত কথাটুকুর হাসান হওয়া সমর্থন করা সঠিক নয়।”[50]

অর্থাৎ, কাবীসাহ বর্ণিত ‘বুকে হাত রাখা’ সম্পর্কিত হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল তাই দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।



(ঘ) ইমাম আবু দাউদ বলেনঃ


“আমাদেরকে আবূ তাওবা বলেছেন, আমাদেরকে হাইসাম ইবন হুমাইদ বলেছেন, আমাদেরকে সাওর বলেছেন, তিনি সুলাইমান ইবন মূসা থেকে, তিনি তাউস থেকে[51], তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতের মধ্যে থাকা অবস্থায় তার ডান হাতকে তার বাম হাতের উপর রাখতেন, অতঃপর উভয়কে বুকের উপর চেপে ধরতেন।”[52]
উপরোক্ত হাদীসটিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তাবিয়ী তাউস সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন কোনো সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে, আমরা জানি তাবিয়ীগন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেননি। তাই এই হাদীসটি ‘মুরসাল’[53]। আর হাদীসতাত্ত্বিকভাবে ‘মুরসাল’ হাদীস দুর্বল বলে গণ্য। হাদীসটির সনদের পর্যালোচনাঃ

(ক) হাদীসের প্রথম রাবীঃ আবূ তাওবা রাবী ইবন নাফি(মৃঃ ২৪১ হিজরী), তিনি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য রাবী।
(খ) হাদীসের দ্বিতীয় রাবীঃ হাইসাম ইবন হুমাইদ, তাকে কিছু মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন তার ‘কাদারিয়া’ মতের কারনে।
(গ) হাদীসের তৃতীয় রাবীঃ সাওর ইবন ইয়াযিদ, তিনি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য রাবী।
(ঘ) হাদীসের চতুর্থ রাবীঃ সুলাইমান ইবন মূসা সত্যপরায়ণ রাবী। তবে মৃত্যুর অল্প আগে তার স্মৃতি বিলোপ ঘটে। ইমাম মুসলিম তার বর্ণনা গ্রহন করেছেন।
(ঙ) হাদীসের পঞ্চম রাবীঃ তাউস ইবন কাইসান(মৃঃ ১০৬ হিজরী) ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম স্বীকৃত সুপ্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য তাবিয়ী।

এভাবে আমরা দেখেছি যে, হাইসাম ইবন হুমাইদ ছাড়া এ সনদের রাবীগন ইমাম মুসলিম শর্তানুসারে নির্ভরযোগ্য। হাইসাম ইবন হুমাইদ-কে কেউ কেউ কিছুটা দুর্বল বলে গণ্য করেছেন।
এছাড়াও হাদীসটি মুরসাল। তাউস তাবিয়ী। তিনি কার কাছ থেকে হাদীসটি শুনেছেন তা বলেন নি। মুরসাল হাদীস গ্রহনের বিষয়ে ফকীহগন মতভেদ করেছেন। হাদীসতাত্ত্বিকভাবে মুরসাল হাদীস দুর্বল বলে গণ্য।
শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী(রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদীস সম্পর্কে বলেনঃ

“এ হাদীসটি মুরসাল হলেও তা সকলের নিকটই প্রমান হিসেবে স্বীকৃত। অধিকাংশ আলীম মুরসাল হাদীসকে প্রমান হিসেবে গ্রহন করেছেন। তাদের মতে তো এটি গ্রহণযোগ্য। আর যারা মুরসাল হাদীস অন্য বর্ণনা দ্বারা প্রমানিত না হলে গ্রহন করেন নি তাদের নিকটও এ মুরসাল হাদীসটি গ্রহণযোগ্য; কারন এ হাদীসটির দুটি প্রমান করেছেঃ

প্রথম প্রমান ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদীস(‘খ’ নং হাদীস যা ইবন খুজাইমাও সংকলন করেছেন)…, বাইহাকী দুটি সনদে হাদীসটি সংকলন করেছেন। এর দুটি বর্ণনার একটি অন্যটির শক্তি বৃদ্ধি করে।
দ্বিতীয় প্রমাণ কাবীসাহ ইবন হুলব থেকে বর্ণিত(আলোচ্য ‘গ’ নং হাদীস)। এ তিনটি হাদীস প্রমাণ করে যে ‘বুকের উপর’ হস্তদ্বয় রাখাই সুন্নাত। এ তিনটি হাদীস যিনি একত্রে বিচার করবেন তিনি সন্দেহমুক্ত হবেন যে, এগুলো প্রমাণ হিসেবে পেশ করার যোগ্য। পক্ষান্তরে নাভীর নিচে হাত রাখার হাদীস সর্বসম্মতভাবে দুর্বল। নববী, যাইলাই ও অন্যান্য আলীম তা উল্লেখ করেছেন।”[54]


শাইখ মুকবিল ও শাইখ খালিদ শায়ি দ্বিবিদভাবে ভিন্নমত পোষণ করেছেনঃ

প্রথমতঃ এ হাদীসটি(‘ঘ’ নং তাউস এর মুরসাল হাদীসটি) মুরসাল হওয়া ছাড়াও এর অন্য দুর্বলতা যে, এর বর্ণনাকারী সুলাইমান ইবন মূসা এবং বিশেষত হাইসাম ইবন হুমাইদের বিষয়ে মুহাদ্দিসগনের আপত্তি রয়েছে। ইলমে হাদীসের ইমামগনদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, কোনো রাবীর বর্ণনা কিছু দুর্বলতা থাকলেই শুধু তারা তাকে ‘সিকাহ’ বা নির্ভরযোগ্য না বলে ‘সাদুক’ বা সত্যপরায়ন বলেছেন। এ সকল রাবীর বর্ণনা অন্যান্য রাবীদের বর্ণনার সাথে যাচাই করে গ্রহন করতে হয়। অন্য সকল রাবীর বিপরীতে শুধু তাদের বর্ণিত হাদীসকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহন করা যায় না। যারা মুরসাল হাদীসকে এককভাবে প্রমাণ হিসেবে গ্রহন করেছেন এবং যারা অন্যান্য প্রমাণ সাপেক্ষ গ্রহন করেছেন সকলেই একমত যে, মুরসাল হাদীস তখনই প্রমাণ বা গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয় যখন তার সনদ ‘তাবিয়ী’ পর্যন্ত ‘সহীহ’ হয়। এ হাদীসটিকে(আলোচ্য ‘ঘ’ নং তাউসের হাদীস) এ পর্যায়ের ‘সহীহ মুরসাল’ বলে গণ্য করা যায় না।

দ্বিতীয়তঃ অন্য যে দুটো হাদীসকে শাইখ আলবানী এ হাদীসের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সে হাদীসদুটোও ‘শাযয’ ও ‘মুদাল্লাস’ হওয়ার কারনে অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য। এজন্য এদুটো হাদীস প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য এ তিনটি হাদীস একত্রে গ্রহণযোগ্য বলে প্রমানিত হয় না।[55]

কেউ কেউ কিছু হাদীসের এ অংশ দ্বারাও ‘বুকে হাত রাখা’ প্রমাণ করতে চানঃ “তিনি(রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ডান হাত তার বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন।” শাইখ আলবানী হাদীসের এ অংশকে ‘বুকে হাত রাখার’ পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেছেনঃ

“এ কথা জানতে হবে যেমন হাদীসে বলা হয়েছেঃ তিনি তার ডান হাত তার বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। এতে প্রমানিত হয় যে, তিনি হস্তদ্বয়কে তার বুকের উপর রেখেছিলেন।”[56]

প্রকৃতপক্ষে হাদীসের এ অংশটি শাইখ আলবানীর এ দাবীর পক্ষে নিশ্চিত প্রমান নয়। হাদীসের ঠিক এই একই অংশ দিয়ে ইমাম ইবনুল মুনযির নাভীর উপরে বা নিচে হাত রাখার কথা বলেছেন।
পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগন ‘ডান হাত’ বলতে হাতের ‘করতল’ বুঝেছেন। আর ডান হাতের করতলকে বাম হাতের পাতা ও কব্জিসহ বাহুর কিয়দাংশের উপর রাখলে হস্তদ্বয় বুকের উপর থেকে শুরু করে নাভীর নিচে পর্যন্ত রাখা সম্ভব।[57]






রেফারেন্স সমুহ :





[42] . ড. মাহির ইয়াসীন, আসার ইলালিল হাদীস ফী ইখতিলাফিল ফুকাহা, ৬/৬৮। আরো দেখুনঃ ইমাম নববী, আল-মাজমূ, ৩/৩১৩ ; ইমাম ইবন কুদামা, আল-মুগনী, ১/৫৪৯
[43] . মুসনাদে ইমাম আহমাদ
[44] . শাযয এর সংজ্ঞাঃ কোনো হাদীস যদি অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য রাবী এককভাবে বর্ণনা করেন, কিন্তু তাদের বিপরীতে একজন নির্ভরযোগ্য রাবী অন্যরূপ বর্ণনা করেন তবে হাদীসটিকে ‘শাযয’ বলা হয়।
[45] . অজ্ঞাত পরিচয় এর অর্থ হলো উক্ত রাবী বা বর্ণনাকারী সম্পর্কে জানা যায় না, তাই উক্ত রাবীর হাদীস গ্রহণযোগ্য কিনা তাও জানা যায় না।
[46] . বর্ণনাটি হচ্ছেঃ
ইমাম তিরমিযী বলেনঃ “আমাদেরকে কুতাইবা বলেছেন, আমাদেরকে আবুল আহওয়াস বলেছেন, তিনি সিমাক ইবন হারব থেকে, তিনি কাবীসাহ ইবন হুলব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ইমামতি করতেন, তখন তিনি তার বাম হাতকে ডান হাত দিয়ে ধরতেন।” [সুনানে তিরমিযী, ২/৩২]
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হাদীসটি সংকলন করেছেন ইবন আবী শাইবা থেকে, ওকী থেকে, সুফিয়ান সাওরী থেকে সিমাক থেকে। তার বর্ণনায়ঃ “তখন তিনি তার ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখতেন।” [মুসনাদে আহমাদ, ৫/২২৬]
ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আর শাইখ আলবানী হাদীসটিকে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন। পক্ষান্তরে শাইখ শুআইব আরনাঊত বলেনঃ “কাবীসাহ অজ্ঞাতপরিচয় রাবী হওয়ার কারনে এ সনদটি দুর্বল।” [আলবানী, সহীহ ওয়া যায়ীফ সুনানিত তিরমিযী, ১/২৫৬ ; মুসনাদে ইমাম আহমাদ(শুআইব আরনাঊতের টীকা সহ), ৫/২২৬]
[47] . ইবন মুফলিহ, আল-ফুরু, ২/১০৯
[48] . ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রাহিমাহুল্লাহ) নিজে সালাতে ‘বুকে হাত রাখা’ বিষয়ে হাদীস সংকলন করেছেন তার ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে, কিন্তু তিনি নিজেই তা গ্রহন করেন নি, এ থেকে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় যে, উক্ত হাদীসটি দুর্বল বলে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল তা গ্রহন করেন নি। আর ইমাম আহমাদ সালাতে ‘বুকে হাত রাখা’কে মাকরুহ বলতেন, যা পরবর্তীতে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহও বলেছেন। যদি আলোচ্য হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল না হতো তাহলে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হাদীসটি পাওয়া সত্ত্বেও ‘বুকে হাত রাখা’কে মাকরুহ বলতেন না। ইলমে হাদীস সম্পর্কে যার প্রাথমিক জ্ঞান রয়েছে তিনিও জানেন যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হাদীস শাস্ত্রে একজন নক্ষত্রতুল্য ইমাম ও হাফীযুল হাদীস ছিলেন। তিনি সেই ব্যক্তি ছিলেন যাকে ৪০ হাজার প্রশ্ন করা হয়েছিল আর প্রশ্নের জবাবে ইমাম আহমাদ শুধুই হাদীস বলেছিলেন। আর ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে যার প্রাথমিক জ্ঞান রয়েছে তিনিও জানেন যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল কোরআন এবং সুন্নাহর দৃঢ় অনুসারী ছিলেন, এর জন্য তাকে সহ্য করতে হয়েছিল কঠোর শাস্তি। তিনি ছিলেন বিদ’আতীদের আতঙ্ক। তাই ‘বুকে হাত রাখা’ সম্পর্কিত হাদীস পাওয়া সত্ত্বেও তার বিপক্ষে মত প্রকাশ করার অর্থ এই যে, ‘বুকে হাত রাখা’ সম্পর্কিত হাদীসগুলো অত্যন্ত দুর্বল।
[49] . ইমাম আবু দাউদ, মাসায়েলে আহমাদ, পৃঃ ৩১
[50] . মুকবিল ওয়াদায়ী ও খালিদ শায়ি, আল-ই’লাম, পৃঃ ১৭
[51] . তাউস, ইনি হচ্ছেন তাবিয়ী তাউস ইবন কাইসান(মৃঃ ১০৬ হিজরী), তাউস সরাসরি বলেছেনঃ ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতের মধ্যে…’। এরুপ হাদীসকে মুরসাল বলা হয়। এরুপ হাদীস দুর্বল বলে গণ্য।
[52] . সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড-১, হাদীসঃ ৭৫৯ [ইসলামী ফাউনডেশন বাংলাদেশ]
[53] . মুরসাল হাদীসের সংজ্ঞাঃ কোনো হাদীসে যদি তাবিয়ী তার পরবর্তী বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ না করে সরাসরি ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ থেকে বর্ণনা করেন তাহলে সেই হাদীসকে মুরসাল হাদীস বলা হয়। এরুপ হাদীস দুর্বল বলে গণ্য। কেননা তাবিয়ী কার কাছ থেকে হাদীসটি শুনেছেন তা তিনি বলেন নি।
[54] . আলবানী, আহকামুস জানাইয, পৃঃ ১১৮-১১৯
[55] . ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতের মধ্যে হাত বাধার বিধান, পৃঃ ৪৭
[56] . বিস্তারিত আলোচনাঃ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতের মধ্যে হাত বাধার বিধান, পৃঃ ২০-২২, ৪৭
[57] . মুকবিল ওয়াদায়ী ও খালিদ শায়ি, আল-ই’লাম, পৃঃ ১৭







Friday, August 14, 2015

সালাতে কোথায় হাত বাধতে হবে? (পর্ব ১)

উত্তরঃ এ ব্যাপারে চার ধরনের বর্ননা পাওয়া যায় :

★ সালাতে হাত রাখবে বুকে[1],
★ বুকের নীচে নাভীর উপরে[2] (সর্বোত্তম)
★ নাভীর নিচে[3]। (সর্বোত্তম)
★ গলা বা কন্ঠনালীর নিচে হাত বাধা [26]

সুত্র :

[1] . সুনানে আবু দাউদ, তাউস কর্তৃক বর্ণিত মুরসাল(যঈফ) হাদীস; ইবনু খুজাইমাতে বর্ণিত যঈফ হাদীস।(বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে)
[2] . সুনানে আবু দাউদ, আলী(রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত যঈফ হাদীস।
[3] . সুনানে আবু দাউদ, আলী(রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত যঈফ হাদীস।
[26], বায়হাকী : সুনানে কুবরা



হানাফী মাযহাবের মত[4],
শাফিয়ী মাযহাবের একটি মত[5],
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের প্রসিদ্ধ মত[6],
হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত[7] অনুসারে সালাতে হাত নাভীর নিচে রাখা উত্তম,
ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি, সুফিয়ান সাওরী প্রমুখ মুহাদ্দিস ফকীহও এ মতটি গ্রহন করেছেন।[8]
ইমাম মালিক ইবন আনাস এবং আহমাদ ইবন হাম্বলের একটি মত[9], এবং
শাফিয়ী মাযহাবের মূল মত[10] অনুসারে সালাতে হাত নাভীর উপরে বুকের নিচে রাখা উত্তম। কিছু হানাফী ফকীহ বলেছেন যে শাফিয়ীদের মতে বুকে হাত বাধবে কিন্তু এরুপ কোনো কথা শাফিয়ী ফকীহগন বর্ণনা করেছেন বলে জানা যায় না।

সুত্র :

[4] . মারগীনানী, আল-হেদায়া, ১/৪৭
[5] . ইমাম নববী, আল-মাজমূ ৩/৩১০-৩১৩ ; মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/৮৩
[6] . ইবনুল কায়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৩/৯১ ; ইবন কুদামা, আল-মুগনী ১/৫১৪-৫১৫
[7] . আলী ইবন সুলাইমান মারদাবী, আল-ইনসাফ, ২/৩৫
[8] . শাওকানী, নাইলুল আওতার, ২/২০৩
[9] . ইবনুল কায়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৩/৯১ ; ইবন কুদামা, আল-মুগনী ১/৫১৪-৫১৫ ; শাওকানী, নাইলুল আওতার, ২/১৮৯ ; বাকর আবু যাইদ, লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাত, পৃঃ ১২
[10] . ইমাম নববী, আল-মাজমূ ৩/৩১০-৩১১




এ ব্যাপারে বিখ্যাত মুহাদ্দিসগ এর বক্তব্য :




প্রখ্যাত শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম নববী(রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ

“হস্তদ্বয় বুকের নিচে এবং নাভীর উপরে রাখবে। এটিই হচ্ছে মাযহাবের লিপিবদ্ধ নিশ্চিতকৃত সঠিক মত। এ বিষয়ে আবূ ইসহাক মারওয়াযীর আরেকটি প্রসিদ্ধ মত আছে, তা হলো, হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখতে হবে। প্রথম মতটিই (আমাদের)মাযহাব।”[11]

প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও হাম্বলী ফকীহ আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহ) (মৃঃ ৫০৮ হিজরী) বলেনঃ

“ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের নিচে রাখবে। এটি (ইমাম)শাফিয়ীর মত। আহমাদ(ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল) থেকে বর্ণিত মত যে, হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখবে। তার অন্য মত বিষয়টি মুসাল্লীর ইচ্ছাধীন। আমাদের(হাম্বলী মাযহাবের) মতটিই(নাভীর নিচে রাখা) সালাতের বিনয় ও বিনম্রতার জন্য বেশী উপযোগী।”[12]

ইমাম নববী(রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ

“তাকবীরে তাহরীমার পর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা মুসতাহাব। এভাবে হস্তদ্বয় বুকের নিচে নাভীর উপরে রাখবে। এটিই আমাদের(শাফিয়ী মাযহাবের) প্রসিদ্ধ মত। অধিকাংশ ফকীহ এ মত গ্রহন করেছেন। আবু হানীফা, সুফিয়ান সাওরী, ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি এবং আমাদের মাযহাবের আবূ ইসহাক মারওয়াযী বলেন যে, হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখবে। আলী(রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে এ দু মাযহাবের পক্ষে দুটি বর্ণনা রয়েছে। ইমাম আহমাদ(ইবন হাম্বল) থেকে দুটি মত বর্ণিত উপরের দুটি মাযহাবের মত। ইমাম আহমাদের তৃতীয় মত যে, এ বিষয়ে উত্তম বলে কিছু নেই; কাজেই বিষয়টি মুসাল্লীর ইচ্ছাধীন। ইমাম আওযায়ী এবং ইবনুল মুনযির এ মত গ্রহন করেছেন। ইমাম মালিক থেকে দুটি মত বর্ণিতঃ এক মতে হস্তদ্বয় বুকের নিচে রাখবে, অন্য মতে হস্তদ্বয় একটির উপর অন্যটি রাখবে না, বরং ঝুলিয়ে রাখবে। মালিকী মাযহাবের অধিকাংশ আলিম দ্বিতীয় মতটি বর্ণনা করেছেন এবং এটিই তাদের নিকট অধিক প্রসিদ্ধ।”[13]

এখানে আমরা দেখছি যে, ইমাম নববী(রাহিমাহুল্লাহ) ফকীহগনের ৪টি মত উল্লেখ করেছেনঃ

(১) নাভীর উপরে বুকের নিচে রাখা,
(২) নাভীর নিচে রাখা,
(৩) বিষয়টি মুসল্লীর ইচ্ছাধীন,
(৪) হস্তদ্বয় ঝুলিয়ে রাখা।

(কিন্তু) বুকের উপরে রাখা বা গলার নিচে রাখার মত দুটি তিনি উল্লেখ করেন নি।…পূর্ববর্তী কোনো ফকীহ এ মত দুটি গ্রহন করেছেন বলে জানা যায় না।[14]
তবে সমসাময়িক কিছু আলীম বুকের উপর হাত বাধার মত প্রকাশ করেছেন।[15]
অপরদিকে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল[16] এবং
প্রসিদ্ধ হাম্বলী ফকীহ, মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ[17] বুকে হাত বাধাকে ‘মাকরুহ’ বা অপছন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছেন।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ(রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ

“এবং সে (সালাতে)হাত বাধবে নাভীর নিচে অথবা বুকের নিচে(নাভীর উপরে), এর কোনোটিই অপছন্দনীয় নয়(দুটিই বৈধ)।”[18]


প্রসিদ্ধ হাম্বলী ফকীহ ইমাম মুওয়াফফাক উদ্দীন ইবন কুদামাহ(মৃঃ ৬২০ হিজরী) বলেনঃ

“হস্তদ্বয় রাখার স্থান সম্পর্কে ইমাম আহমাদ থেকে একাধিক মত বর্ণিত হয়েছে। এক বর্ণনায় তিনি বলেছেনঃ নাভীর নিচে রাখবে। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেনঃ নাভীর উপরে রাখবে। তৃতীয় বর্ণনায় তিনি বলেনঃ মুসল্লী এ বিষয়ে স্বাধীন, সে যেখানে ইচ্ছা রাখতে পারে; কারন সবই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিষয়টি প্রশস্ত।”[19]

সুনানে তিরমিযী গ্রন্থের লিখক, প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ঈসা আত-তিরমিযী(রাহিমাহুল্লাহ) সালাতে হস্তদ্বয় রাখার একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেনঃ

“সাহাবীগন, তাবিয়ীগন ও পরবর্তী যুগের আলীমগন এ হাদীসের উপর আমল করেন। তারা মত প্রকাশ করেন যে, সালাতের মধ্যে মুসল্লী তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখবে। তাদের কারো মতে হস্তদ্বয় নাভীর উপরে রাখবে। আর কারো মতে হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখবে। বিষয়টি তাদের মতে প্রশস্ত।”[20]

ইমাম তিরমিযীর ভাষ্য অনুসারে হাত রাখাই(বাধাই) সুন্নাত, রাখার স্থানটির বিষয় প্রশস্ত, নাভীর উপরে বা নিচে রাখা যেতে পারে। লক্ষনীয় যে, তিনি এখানে গলার নিচে বা বুকের উপরে হাত রাখার মত উল্লেখ করেন নি।


ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রাহিমাহুল্লাহ) এবং ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি(রাহিমাহুল্লাহ) এই দুই প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগনের প্রসিদ্ধ ছাত্র, মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম ইসহাক ইবন মানসূর আল-কাওসাজ আল-মারওয়াযী(মৃঃ ২৫১ হিজরী) তাদের দুজন থেকে ফিকহী মাসআলা জিজ্ঞাসা করে তা সংকলন করেন। তার বইটির নাম ‘মাসাইলুল ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল ওয়া ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি’। এ গ্রন্থে তিনি(ইমাম মারওয়াযী) বলেনঃ

“আমি (ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলকে) বললামঃ যদি বাম হাতের উপর ডান হাত রাখে তাহলে হস্তদ্বয় কোথায় রাখবে? তিনি বললেনঃ নাভীর উপরে ও নিচে, কোনোটিতেই অসুবিধা নেই, সবই আমার মতে প্রশস্ত। ইসহাক(ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি) বলেনঃ তিনি(ইমাম আহমাদ) যেমন বলেছেন। নাভীর নিচে রাখা হাদীসের আলোকে শক্তিশালী এবং বিনয়ের জন্য বেশী উপযোগী।”[21]

ইমাম ইবনুল মুনযির(মৃঃ ৩১৯ হিজরী)(রাহিমাহুল্লাহ) সালাতে হাত রাখার স্থান সম্পর্কে ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি এর মত উল্লেখ করে বলেনঃ

“ইসহাক বলেছেনঃ নাভীর নিচে রাখা হাদীসের দৃষ্টিতে অধিক শক্তিশালী ও বিনম্রতার জন্য অধিক উপযোগী।”[22]

কেউ কেউ দাবী করেন যে, ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি(রাহিমাহুল্লাহ) সালাতে ‘বুকে’ হাত রাখতেন, শাইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রাহিমাহুল্লাহ)ও এই দাবী করেছেন এবং ‘বুকে’ হাত রাখার জন্য শাইখ আলবানী ইমাম ইসহাকের প্রশংসাও করেছেন। শাইখ আলবানী(রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ

“এ সুন্নাতটির(সালাতে বুকে হস্তদ্বয় রাখা) বিষয়ে মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ইমাম ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি। মারওয়াযী তার মাসাইল গ্রন্থের ২২২ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ ‘ইসহাক আমাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। … তিনি কুনূতের মধ্যে হস্তদ্বয় উত্তোলন করতেন, রুকুর পূর্বে কুনূত পড়তেন এবং তার হস্তদ্বয় তার স্তনদ্বয়ের উপর অথবা স্তনদ্বয়ের নিচে রাখতেন।’”[23]


ইমাম মারওয়াযী(রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ

‘ইসহাক আমাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। … তিনি কুনূতের মধ্যে হস্তদ্বয় উত্তোলন করতেন, রুকুর পূর্বে কুনূত পড়তেন এবং তার হস্তদ্বয় তার স্তনদ্বয়ের উপর অথবা স্তনদ্বয়ের নিচে রাখতেন।’
এটি দ্বারা শাইখ আলবানী বলেছেন যে, ইমাম ইসহাক সালাতে হস্তদ্বয় বুকে রাখতেন। কিন্তু মারওয়াযীর গ্রন্থের টীকাকার[24] বলেনঃ

“এখানে কাওসাজ(ইমাম মারওয়াযী)এর কথার অর্থ হলো, ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহি কুনুতের সময় হস্তদ্বয় উত্তোলন করে তার স্তনদ্বয়ের বরাবর বা স্তনদ্বয়ের নিচে দুআর জন্য তুলে রাখতেন। এর অর্থ এ নয় যে, তিনি হস্তদ্বয় স্তনদ্বয়ের উপরে বা নিচে রাখতেন।
এর প্রমাণ হলো, ইবন কুদামা মুগনী গ্রন্থের ২/৫৮৪-এ ইমাম আহমাদের মত উল্লেখ করেছেন যে, কুনুতের সময় দু হাত দুআর জন্য বুক পর্যন্ত উঠাবে। এরপর বলেনঃ ইসহাকও এ মত পোষণ করেছেন। দ্বিতীয় বিষয় হলো, ইসহাক(রাহিমাহুল্লাহ) ফরয বা বিতর কোনো সালাতেই বুকের উপর হাত রাখার মত পোষণ করতেন না; বরং তিনি নাভীর নিচে হাত রাখার মত পোষণ করতেন, যা কাওসাজ(ইমাম মারওয়াযী) নিজেই উদ্ধৃত করেছেন।
… কাজেই শাইখ আলবানী(রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যে আপত্তির অবকাশ আছে। কাওসাজের(ইমাম মারওয়াযীর) পূর্বাপর বক্তব্য শাইখ আলবানীর বক্তব্য সমর্থন করে না।”[25]




‘গলার নিচে’ হাত বাধা সম্পর্কিত হাদীসের পর্যালোচনাঃ



(ক) ইমাম বাইহাকী বলেনঃ “আমাদেরকে আবূ যাকারিয়া ইবন আবী ইসহাক বলেন, আমাদেরকে হাসান ইবন ইয়াকূব বলেন, আমাদেরকে ইয়াহইয়া ইবন আবী তালিব বলেন, আমাদেরকে যাইদ ইবনুল হুবাব বলেন, আমাদেরকে রাওহ ইবনুল মুসাইব বলেন, আমাকে আমর ইবন মালিক নুকরী বলেন, তিনি আবুল জাওযা থেকে, তিনি ইবন আব্বাস(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি সূরা কাওসারে (তোমার রব্বের জন্য সালাত আদায় কর এবং নাহর কর)- আল্লাহর এ কথার ব্যাখ্যায় বলেনঃ ‘নাহর’ করার অর্থ ডান হাতকে বাম হাতের উপর সালাতের মধ্যে ‘নাহর’ বা কণ্ঠনালীর কাছে রাখা।”[26]

হাদিস পর্যালোচনা :

এ হাদীসের ভিত্তি রাওহ ইবনুল মুসাইব[27] নামক রাবীর উপর। এই রাবীর বিষয়ে :

★ ইমাম ইয়াহইয়া ইবন মঈন বলেনঃ (صويلح) কোনো রকম গ্রহনযোগ্য।
★ রাযী বলেনঃ কোনো রকম গ্রহণযোগ্য তবে শক্তিশালী নয়।
★  ইবন আদী বলেন, লোকটি অনেক অনির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবন হিব্বান বলেনঃ লোকটি নির্ভরযোগ্য রাবীদের সূত্রে জাল[28] হাদীস বর্ণনা করে; তার হাদীস গ্রহন করা বৈধ নয়। তার(রাওহ ইবনুল মুসাইবের) উস্তাদ আমর ইবন মালিক আন-নুকরী সম্পর্কে ইবন আদী বলেনঃ মুনকারুল হাদীসঃ লোকটি আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী এবং হাদীস চুরি করে।[29]
অর্থাৎ এই মাউকূফ হাদীসটির সনদ অত্যন্ত দুর্বল বলে প্রমানিত হলো।[30]



বুকের উপর বা বুকে হাত বাধা সম্পর্কিত হাদীসসমূহের পর্যালোচনাঃ


(ক) ইমাম বাইহাকী বলেনঃ

“আমাদেরকে আবূ সা’দ আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ সূফী বলেন, আমাদেরকে আবূ আহমাদ ইবন আদী বলেন, আমাদেরকে ইবন সায়িদ বলেন, আমাদেরকে ইবরাহীম ইবন সাঈদ বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবন হুজর আল-হাদরামী বলেন, আমাকে সায়ীদ ইবন আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল তার পিতা থেকে তার মাতা থেকে ওয়ায়িল(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি মাসজিদের দিকে উঠে যেয়ে মিহরাবে ঢুকলেন, অতঃপর তাকবীর বলে হস্তদ্বয় উঠালেন, অতঃপর তার ডান হাত বাম হাতের উপরে বুকের উপরে রাখলেন।”[31]

শাইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী উল্লেখ করেছেন যে, (উপরোক্ত)হাদীসটি তিনটি কারনে (যঈফ)দুর্বলঃ

(১) মুহাম্মাদ ইবন হুজর হাদরামী দুর্বল। তার বিষয়ে ইমাম বুখারী বলেনঃ তার বিষয়ে আপত্তি আছে। ইমাম বুখারীর এ কথার অর্থ লোকটি অত্যন্ত দুর্বল। (ইমাম)যাহাবী বলেনঃ লোকটি আপত্তিকর হাদীস বর্ণনা করেছেন।
(২) সায়ীদ ইবন আব্দুল জাব্বারের বিষয়েও আপত্তি রয়েছে। নাসাঈ বলেনঃ তিনি শক্তিশালী নন। ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্যদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।
(৩) ‘আব্দুল জাব্বারের মাতা’ একেবারেই অজ্ঞাত পরিচয়।[32]
অর্থাৎ উপরের হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল[33] এবং দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

(খ) ইমাম ইবন খুযাইমা বলেনঃ

“আমাদেরকে আবূ তাহির বলেন, আমাদেরকে আবূ বকর বলেন, আমাদেরকে আবূ মূসা বলেন, আমাদেরকে মুআম্মাল(ইবন ইসমাঈল) বলেন, তিনি সাওরী থেকে, তিনি আসিম ইবন কুলাইব থেকে তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়ায়িল(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সালাত আদায় করলাম এবং তিনি তার ডান হাত তার বাম হাতের উপর তার বুকের উপর রাখলেন।”[34]



উপরোক্ত হাদীসটিকে ‘সহীহ’ দাবী করে সমসাময়িক কিছু আলীমগন বুকে হাত বাধার পক্ষে মত দিয়েছেন।[35] অপরদিকে কেউ কেউ উপরোক্ত হাদীসটির মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা আছে বলে মন্তব্য করেছেন এবং এর উপর আমল করেছেন।[36] তবে উপরোক্ত হাদীসটি নিতান্তই দুর্বল যা আমরা আলোচনা করবো।
উপরোক্ত হাদীসের মূল সমস্যা দুইটি, যথাঃ

(১) হাদীসটির সনদে থাকা মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল দুর্বল রাবী হিসেবে বিবেচিত।
(২) ওয়ায়িল ইবন হুজর থেকে আসিম ইবন কুলাইবের সনদে আরো কিছু সহীহ হাদীস হাত বাধার পক্ষে বর্ণিত হয়েছে তবে সেখানে হাত কোথায় রাখবে তা বর্ণিত হয়নি[37], তাই হাদীসটি ‘মুনকার’ বা ‘আপত্তিকর’ ও ‘অত্যন্ত দুর্বল’ বলে গণ্য।

হাদিস পর্যালোচনা :

মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল সম্পর্কে :

★ ইমাম আবূ হাতিম রাযী বলেন, তিনি সত্যপরায়ণ; তবে খুব বেশী ভুল করেন।
★ ইমাম বুখারী বলেনঃ তিনি মুনকারুল হাদীস বা আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী। ইমাম বুখারী অত্যন্ত দুর্বল বা মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদেরকেই মুনকারুল হাদীস বলেন।
★ ইবন হাজার আসকালানী বলেনঃ সত্যপরায়ণ; তবে সৃতিশক্তি খারাপ।[38]

★ ইবনুল কায়্যিম বলেনঃ “মুহাদ্দিসগন সুফিয়ান সাওরী থেকে, আসিম ইবন কুলাইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি বলেনঃ ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সালাত আদায় করলাম। তখন তিনি তার ডান হাত তার বাম হাতের উপর, বুকের উপর রাখলেন।’ ‘বুকের উপর’ কথাটি মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল ছাড়া কেউ বলেন নি।”[39]

★ ইবনুল কায়্যিম অন্যত্র বলেনঃ “তিনি(ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল) বলেনঃ … বুকের উপর হাত রাখা মাকরুহ; কারন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ‘তাকফীর’ করতে নিষেধ করেছেন। আর ‘তাকফীর’ অর্থ বুকের উপর হাত রাখা।
মুআম্মাল সুফিয়ান থেকে, আসিম ইবন কুলাইব থেকে তার পিতা থেকে ওয়ায়িল বর্ণনা করেছেন যে, নাবীউল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার হাত বুকের উপর রাখেন। অথচ এ হাদীসটিই আব্দুল্লাহ ইবন ওয়ালীদ সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু তিনি ‘বুকের উপর’ কথাটি উল্লেখ করেন নি।”[40]


★ আব্দুল্লাহ ইবন ওয়ালীদের বর্ণনা ইমাম আহমাদ সংকলন করেছেনঃ “আমাদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ বলেন, আমাকে সুফিয়ান বলেছেন, তিনি আসিম ইবন কুলাইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেঃ আমি নাবীউল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখলাম যে, তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর দিয়ে ধরে রেখেছেন।”

বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে অনেকেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন; কিন্তু কেউই ‘বুকের উপর’ কথাটি বলেন নি। ওয়ায়িলের হাদীসটি আসিম ইবন কুলাইবের সুত্রেও অনেকেই বর্ণনা করেছেন কিন্তু তারাও কেউ ‘বুকের উপর’ কথাটি বলেন নি। এমনকি আসিম ইবন কুলাইব থেকে সুফিয়ান সাওরীর মাধ্যমে একই সনদে অন্যান্য রাবী বর্ণনা করেছেন কিন্তু কেউই ‘বুকের উপর’ কথাটি বলেন নি। শুধুমাত্র ‘মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল’ ‘বুকের উপর’ কথাটি বলেছেন।

এখানে ইবনুল কায়্যিম বুকে হাত রাখা অপছন্দ করার বিষয়ে ইমাম আহমাদের মতের দলীল ব্যাখ্যা করেছেন। বুকে হাত রাখার কথা মুআম্মাল-এর হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু মু’আম্মাল নিজে দুর্বল রাবী। উপরন্তু তিনি নির্ভরযোগ্য রাবীদের বিপরীতে বর্ণনা করেছেন। কাজেই তার বর্ণনা ‘মুনকার’ বা ‘আপত্তিকর’ ও ‘অত্যন্ত দুর্বল’ বলে গণ্য।[41]



রেফারেন্স সমুহ :



[11] . ইমাম নববী, আল-মাজমূ, ৩/৩১০-৩১১
[12] . ইবনুল জাওযী, আত-তাহকীক, ১/৩৩৯
[13] . ইমাম নববী, শারহ সহীহ মুসলিম, ৪/১১৪
[14] . ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতের মধ্যে হাত বাধার বিধান, পৃঃ ১০

[15] . যেমনঃ সৌদি আরবের বিগত প্রধান মুফতী শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালীহ আল-উসাইমীন, শাইখ মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন আলবানী, শাইখ সাঈদ ইবন আলী আল-কাহতানী, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আত-তুওয়াইযিরী। এছাড়াও বাঙ্গালী কিছু আলীম যেমনঃ ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, ড. মনজুরে ইলাহী, ড. আসাদুল্লাহ গালীব, মুফতী কাজী ইবরাহীম, শাইখ মতিউর রহমান মাদানী, শাইখ সাইফুদ্দীন বিলাল মাদানী, শাইখ আবুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী।

[16] . ইবনুল কায়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৩/৯১-৯২
[17] . ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহ উমদাহ আল-ফিকহ ফিল মাযহাব আল-হাম্বলী, পৃঃ ৬৭
[18] . ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহ উমদাহ আল-ফিকহ ফিল মাযহাব আল-হাম্বলী, পৃঃ ৬৭
[19] . ইবন কুদামা, আল-মুগনী, ১/৫৪৯
[20] . সুনানে তিরমিযী, ২/৩২
[21] . মারওয়াযী, মাসাইলুল ইমাম আহমাদ ওয়া ইসহাক, ১/৫৫১-৫৫২
[22] . ইবনুল মুনযির, আল-আউসাত, ৪/১৮৫-১৮৭
[23] . আলবানী, ইরওয়াউল গালীল, ২/৭১
[24] . মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়য়ের গবেষণা বিভাগ।
[25] . মারওয়াযী, মাসাইলুল ইমাম আহমাদ, টীকা, ৯/৪৮৫১
[26] . বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ২/৩১
[27] . অর্থাৎ, উপরোক্ত হাদীসের সনদের মধ্যে এই রাবী বিদ্যমান এবং এই রাবী যদি দুর্বল হয় তাহলে উপরোক্ত হাদীসও দুর্বল বা যঈফ বলে প্রমানিত হবে।
[28] . জাল অর্থাৎ বানোয়াট হাদীস, যা হাদীস নয় বরং কারো বানানো কথা হাদীস বলে চালিয়ে দেওয়া।
[29] . ড. ইবরাহীম আনীস, আম-মু’জামুল ওয়াসীত, ১/৫০৯ ; ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতের মধ্যে হাত বাধার বিধান, পৃঃ ৩০
[30] . ইবনুল মুলাক্কিন, সিরাজ উদ্দীন উমার ইবন আলীঃ আল-বাদরুল মুনীর, ৪/৮১ ; বাকর আবু যাইদ, লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাত, পৃঃ ৯
[31] . বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ২/৩০
[32] . আলবানী, সিলসীলা যায়ীফাহ, ১/৬৪৩-৬৪৭
[33] . মুকবিল ওয়াদায়ী ও খালীদ শায়ি, আল-ই’লাম বি তাখয়ীরিল মুসাল্লী, পৃঃ ১০-১৩
[34] . সহীহ ইবন খুযাইমা, ১/২৪৩। [বিঃ দ্রঃ ইমাম ইবন খুযাইমা তার হাদীস গ্রন্থের নাম ‘সহীহ’ রাখলেও এতে সহীহ ও যঈফ সকল প্রকার হাদীস বিদ্যমান, এটি ইলমুল হাদীস সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান সম্পূর্ণ সকল মানুষই জানেন।]
[35] . যেমনঃ শাইখ মতিউর রহমান মাদানী। আর শাইখ আব্দুল হামীদ ফাইযী দাবী করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সালাতে) উভয় হাতকে বুকের উপর রাখতেন।[সালাতে মুবাশশির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), পৃঃ ১৪৪]
[36] . যেমনঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালীহ আল-উসাইমীন, তিনি বলেছেনঃ “হাদীসটিতে সামান্য দুর্বলতা থাকলেও এক্ষেত্রে বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের তুলনায় এটিই সর্বাধিক শক্তিশালী।” [ইবন উসাইমীন, ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম, পৃঃ ২৯৮]
[37] . এখানে এরুপ দুটি হাদীস উল্লেখ করছি যা ওয়ায়িল ইবন হুজর থেকে বর্ণিত কিন্তু ‘বুকের উপর’ কথাটি নেই।


ইমাম মুসলিম বলেনঃ “আমাদেরকে যুহাইর ইবন হারব বলেন, আমাদেরকে আফফান বলেন, আমাদেরকে হাম্মাম বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবন জুহাদাহ বলেন, আমাকে আব্দুল জাব্বার ইবন ওয়ায়িল বলেন, তিনি আলকামা ইবন ওয়ায়িল ও তাদের একজন মাওলা থেকে, তারা ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি দেখেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শুরু করতেন তখন তার দু হাত উঠালেন- হাম্মাম হাত উঠানোর বর্ণনা দিয়ে বলেনঃ তার কান পর্যন্ত – আল্লাহু আকবর বলেন। এরপর তিনি তার কাপড় জড়িয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন।” [সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত, ১/৩০১]
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেনঃ “আমাদেরকে ইউনুস ইবন মুহাম্মাদ বলেন, আমাদেরকে আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, আমাদেরকে আসিম ইবন কুলাইব তার পিতা থেকে, তিনি ওয়ায়িল ইবন হুজর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে, তিনি বলেনঃ আমি নাবীউল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করলাম আর বললাম, তিনি কিভাবে সালাত আদায় করেন তা আমি দেখবো। তিনি বলেনঃ তিনি তখন কিবলামুখী হলেন, আল্লাহু আকবার বললেন এবং তার কাধদ্বয় পর্যন্ত হস্তদ্বয় উঠালেন। তিনি বলেনঃ এরপর তিনি তার ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরলেন।” [ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩১৬(শুআইব আরনাউতের টীকাসহ)]
উপরোক্ত হাদীসটি ওয়ায়িল ইবন হুজর থেকে ‘আসিম ইবন কুলাইব’ এর সুত্রে বর্ণিত কিন্তু এখানেও ‘বুকের উপর’ কথাটি নেই। শুধুমাত্র ‘মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল’ এর বর্ণনায় ‘বুকের উপর’ কথাটি রয়েছে। যেহেতু ‘মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল’ এর বর্ণনা তার থেকে শক্তিশালী রাবীর বর্ণনার বিরুদ্ধে যাচ্ছে সেহেতু ‘মুআম্মাল ইবন ইসমাঈল’ এর বর্ণিত ‘বুকের উপর’ হাত বাধার হাদীসটি মুনকার বা দুর্বল অর্থাৎ দলীল হিসেবে অগ্রহনযোগ্য।


[38] . ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব, ১০/৩৩৯-৩৪০ ; তাকরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৫৫৫
[39] . ইবনুল কায়্যিম, ই’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন, ২/৪০০
[40] . ইবনুল কায়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৩/৯১
[41] . বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ ড.খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার এর ‘সালাতের মধ্যে হাত বাধার বিধান’ বইটি। উক্ত বইটির পিডিএফ ডাউনলোড করতে ভিসিট করুনঃ http://www.quranheart.com
















Thursday, July 30, 2015

জুম'আর ফজীলত সমুহ :



পবিত্র জুমার ফযিলত সম্পর্কে "সুরাতুল জুমা" এর নবম আয়াতে ইরশাদ ফরমানঃ-

হে ঈমানদারগণ,যখন নামাযের আযান হয় জুমা দিবসে,তখন আল্লাহর যিকরের দিকে দৌঁড়াও এবং বেচা-কেনা পরিত্যাগ করো,এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানো|
(পারা-২৮,সুরা-জুমা,আয়াত-০৯...তরজুমায়ে কানযুল ঈমান)


|.......জুমার অর্থ.......|


প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন,হাকীমুল উম্মত,মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বর্ণনা করেন, যেহেতু সেদিনই সমস্ত সৃষ্ট জীবের অস্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে,সেদিনই হযরত আদম ছফীয়্যুল্লাহ (আলাইহিস সালাম) উনার মাটি একত্রিত করা হয়,আর সেদিনই লোকেরা একত্রিত হয়ে জুমার নামায আদায় করে থাকে|তাই সে দিনকে জুমা বলা হয়|ইসলামের পূর্বে আরবরা উহাকে 'আরুবা' নামে অভিহিত করতো|
(মিরাত শরহে মিশকাত,খন্ড-০২,পৃঃ- ৩১৭)


|......দুরুদ শরীফ পড়ার ফযিলত......|


নবীয়ে দো জাহান,রহমতে আলামিয়ান,মাহবুবে রহমান ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেন, "যে ব্যক্তি আমার উপর জুমার দিন দুইশতবার দুরুদ শরীফ পাঠ করবে,তার দুইশত বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে|
(কানযুল উম্মান,খন্ড-১,পৃঃ-২৫৬,হাদীস নং-২২৩৮)


|......গরীবদের হজ্ব.......|


হযরত সাইয়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিআল্লাহতা'লা আনহু) থেকে বর্ণিত, সরকারে নামদার,বি-ইযনে পরওয়ারদিগার উভয় জগতের মালিকো মুখতার,শাহেনশাহে আবরার (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) ইরশাদ ফরমান, "জুমার নামায মিসকিনদের হজ্ব|অন্য বর্ণনায় এসেছে,জুমার নামায গরীবদের হজ্ব|
(কানযুল উম্মাল,খন্ড-৭ম,হাদীস নং-২১০২৭ ও ২১০২৮)

»» রাসুলে আকরাম,নুরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য প্রত্যেক জুমার দিবসে একটি হজ্ব ও একটি ওমরা রয়েছে|জুমার নামাযের জন্য তাড়াতাড়ি বের হওয়া তোমাদের জন্য হজ্ব এবং জুমার নামাযের পর আসরের নামাযের জন্য অপেক্ষা করা ওমরা (এর সমতুল্য)
(আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী,খন্ড-৩,পৃঃ ৩৪২, হাদীস নং ৫৯৮০)


|.....জুমার নামাযে পাগড়ীর ফযিলত....।


সরকারে মদীনা,সুলতানে বা-কারীনা,রাসুলে আকরাম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ও উনার ফিরিশতারা জুমার দিবসে পাগড়ী পরিধানকারীদের উপর দুরুদ শরীফ প্রেরণ করেন|"
(মাযমাউয যাওয়ায়েদ,খন্ড-২,-পৃঃ-৩৯৪,হাদীস নং ৩০৭৫)




|.......আরোগ্যতা দান.......|


হযরত হুমাইদ আবনে আবদুর রহমান (রাদ্বিআল্লাহুতা'লা আনহু) স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে,তিনি ইরশাদ করেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন নখ কাটে,আল্লাহ তা'আলা তার শরীর থেকে রোগ ব্যাধি বের করে তাতে সুস্থ্যতা প্রবিষ্ট করান|
(মুছান্নিফে ইবনে আবী শায়বা,খন্ড-২,পৃঃ ৬৫)

»»অপর এক বর্ণনায় আছে যে, "যে ব্যক্তি জুমার দিন নখ কাটবে,তাঁর নিকট রহমতের আগমন ঘটবে এবং তার পাপরাশি দূরীভূত হবে|
(তানযিয়াতুস শরীআতিল মারফুআ,খন্ড-২,পৃঃ ২৬৯/বাহারে শরীয়ত,খন্ড-১৬,পৃঃ ১৯৫)

বিঃদ্রঃ জুমার দিন হিযামত তথা শিঙা বসানো ও নখ কাটা জুমার নামাযের পরই উত্তম|
(রদ্দুল মুহতার সম্বলিত দুররে মুখতার,খন্ড-০৯,পৃঃ ৫৮১,মুলতান থেকে প্রকাশিত)


॥...জুমার দিন জাহান্নামীদের মুক্তি দান...॥


হুযুর পাক (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেছেন, "জুমার দিনের রাত-দিন ২৪ ঘন্টার মধ্যে এমন কোন ঘন্টা নেই,যার মধ্যে প্রতিনিয়ত ৬ লক্ষ দোযখবাসীকে মুক্তি দেয়া হচ্ছেনা,যাদের উপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে|"
(মুসনাদে আবু ইয়ালা,খন্ড-৩,পৃঃ- ২৩৫,হাদীস নং-৩৪৭১)


॥»»কবরের আযাব থেকে মুক্ত««॥


তাজেদারে মদীনা (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন কিংবা জুমার রাতে মৃত্যু বরণ করবে,সে কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাবে এবং ক্বিয়ামত দিবসে সে এমনিভাবে উঠবে যে,তার উপর শহীদদের মোহর শোভা পাবে|
(হিলআতুল আউলিয়া,খন্ড-৩,পৃঃ-১৮১,হাদীস নং ৩৬৯)


॥»»জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়««॥


রাসুলে পাক (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) ইরশাদ ফরমান, "যে ব্যক্তি জুমার নামায পড়ে,ঐ দিন রোযা রাখে,কোন অসুস্থ্য ব্যক্তির সেবা করে,কোন জানাযায় উপস্থিত হয়,কারো বিয়েতে অংশগ্রহন করে,তবে ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়|
(আল মুজামুল কাবীর,খন্ড-৮ম,পৃঃ-১৯৭,হাদীস নং ৭৪৭৪)


««॥তিন হাজার মাগফিরাত»»॥


রহমতে কাওনাইন,হুযুর পাক (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) ইরশাদ মুবার করেছেন, "যে ব্যক্তি প্রত্যেক জুমার দিন স্বীয় পিতামাতা উভয়ের কিংবা একজনের কবর যিয়ারত করে তথায় সূরা ইয়াছিন পাঠ করবে,আল্লাহ তা'আল্লাহ তাকে সূরা ইয়াছিন শরীফে যতটি অক্ষর আছে ততটি ক্ষমা প্রদর্শন করবেন|
(ইত্তেহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন,খন্ড-১০,পৃঃ-৩৬৩,বৈরুত থেকে প্রকাশিত)


॥««দশ হাজার বছরের রোযার সাওয়াব»»॥॥


ইমামে আহলে সুন্নাত,আযিমুল বারকাত,ইমাম আহমদ রেযা খাঁন বেরেলভী (রাদ্বিআল্লাহুতা'লা আনহু) বলেছেন,বর্ণিত আছে যে, জুমাবারের রোযার সাথে বৃহস্পতিবার অথবা শনিবারের রোযা মিলিয়ে রাখলে দশ হাজার বছরের রোযার সমান সাওয়াব পাওয়া যাবে|
(ফতোয়ায়ে রযবীয়্যাহ শরীফ,নতুন সংস্করণ,খন্ড-১০,পৃঃ ৬৫৩)


অন্যান্য হাদিস থেকে :



১.


আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন,“যে ব্যাক্তি জু’আর দিন ফরজ গোসলের মত গোসল করে প্রথম দিকে মসজিদে হাজির হয়, সে যেন একটি উট কুরবানী করল,দ্বিতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সে যেন একটি গরু কুরবানী করল, তৃতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ছাগল কুরবানী করল। অতঃপর চতুর্থ সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে গেল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। আর পঞ্চম সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল। অতঃপর ইমাম যখন বেরিয়ে এসে মিম্বরে বসে গেলেন খুৎবার জন্য, তখন ফেরেশতারা লেখা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসেযায়।”
(বুখারীঃ ৮৮১, ইফা ৮৩৭, আধুনিক ৮৩০)


২.


রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “জুম’আর সালাতে তিন ধরনের লোক হাজির হয়। (ক) এক ধরনের লোক আছে যারা মসজিদে প্রবেশের পর তামাশা করে, তারা বিনিময়ে তামাশা ছাড়া কিছুই পাবে না। (খ) দ্বিতীয় আরেক ধরনের লোক আছে যারা জুম’আয় হাজির হয় সেখানে দু’আ মুনাজাত করে, ফলে আল্লাহ যাকে চান তাকে কিছু দেন আর যাকে ইচ্ছা দেন না। (গ) তৃতীয় প্রকার লোক হল যারা জুম’আয় হাজির হয়, চুপচাপ থাকে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কারও ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে আগায় না, কাউকে কষ্ট দেয় না, তার দুই জুম’আর মধ্যবর্তী ৭ দিন সহ আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ খাতা আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দেন।” (আবু দাউদঃ ১১১৩)


৩.


রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,“জুম’আর দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতা এসে হাজির হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা সর্বাগ্রে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকে। প্রথম ভাগে যারা মসজিদে ঢুকেন তাদের জন্য উট, দ্বিতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য গরু, তৃতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য ছাগল, চতুর্থবারে যারা আসেন তাদের জন্য মুরগী, ও সর্বশেষ পঞ্চমবারে যারা আগমন করেন তাদের জন্য ডিম কুরবানী বা দান করার সমান সওাব্ব লিখে থাকেন। আর যখন ইমাম খুৎবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে উঠে পড়েন ফেরেশতারা তাদের এ খাতা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসে যান।” (বুখারী ৯২৯, ইফা ৮৮২, আধুনিক ৮৭৬)


৪.


প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ার সওয়াব: আউস বিন আউস আস সাকাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “জুমা’আর দিন যে ব্যাক্তি গোসল করায় (অর্থাৎ সহবাস করে, ফলে স্ত্রী ফরজ গোসল করে এবং) নিজেও ফরজ গোসল করে, পূর্বাহ্ণে মসজিদে আগমন করে এবং নিজেও প্রথম ভাগে মসজিদে গমন করে, পায়ে হেঁটে মসজিদে যায় (অর্থাৎ কোন কিছুতে আরোহণ করে নয়), ইমামের কাছাকাছি গিয়ে বসে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কোন কিছু নিয়ে খেল তামাশা করে না; সে ব্যাক্তির প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য রয়েছে বছরব্যাপী রোজা পালন ও সারা বছর রাত জেগে ইবাদত করার সমতুল্য সওয়াব।” (মুসনাদে আহমাদঃ ৬৯৫৪, ১৬২১৮)


৫.


রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,“পাঁচ বেলা সালাত আদায়, এক জুম’আ থেকে পরবর্তী জুম’আ, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া সকল (সগীরা) গুনাহের কাফফারা স্বরূপ, এই শর্তে যে, বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।” (মুসলিম)


৬.


রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যাক্তি ভালভাবে পবিত্র হল অতঃপর মসজিদে এলো, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শুনতে চুপচাপ বসে রইল, তার জন্য দুই জুম’আর মধ্যবর্তী এ সাত দিনের সাথে আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে খুৎবার সময় যে ব্যক্তি পাথর, নুড়িকণা বা অন্য কিছু নাড়াচাড়া করল সে যেন অনর্থক কাজ করল।’ (মুসলিমঃ ৮৫৭)




যে সালাত মিসওয়াক করে আদায় করা হয়, সেই সালাতে মিসওয়াক করা বিহীন সালাত থেকে ৭০গুণ বেশী নেকী হয়।



সহীহ হাদীসকে জাল হাদীস বানানোর ভয়ংকর ষড়যন্ত্র-

নামধারী আহলে হাদীস সর্দার মুজাফফর লিখেছেন,

যে সালাত মিসওয়াক করে আদায় করা হয়, সেই সালাতে মিসওয়াক করা বিহীন সালাত থেকে ৭০গুণ বেশী নেকী হয়।
একথাটি জাল। এর কোন ভিত্তি নেই।
দেখুন,
জাল হাদীসের কবলে রাসুলুল্লাহ (সা) এর সালাত/৩১

___________________________

জবাবঃ
প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি একটি সতর্কবাণী-
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার উপর মিথ্যাচার করোনা। কেননা যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যাচার করে সে যেন জাহান্নামে প্রবেশ করে।
সহীহ আল বুখারী-১০৬

এবার মূল জবাবঃ

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি বিভিন্ন সনদে এসেছে।

اخرجه الخطيب البغدادي عَن ابْن لَهِيعَة عَن (أبي) الْأسود ، عَن عُرْوَة ، عَن عَائِشَة ، عَن النَّبِي - صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم - قَالَ : «صلاة على أثر سواك أفضل من سبعين صلاة بغير سواك» .

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে সালাত মিসওয়াক করে আদায় করা হয়, সেই সালাত মিসওয়াক করা বিহীন সালাত থেকে ৭০গুণ বেশী উত্তম।

এখানে রয়েছেন-

১/ইমাম খতীব বাগদাদী
২/ইবনু লাহি’আহ
৩/ আবুল আসওয়াদ
৩/উরওয়াহ বিন যুবাইর (রা)
ইবনুল মুলকিন বলেছেন, হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাফিয আবু বাকর আল খাতীব ইবনু লাহী’আহ এর সুত্রে।

রেফারেন্সঃ
আল বাদরুল মুনীর-২/১৭

আবার এ হাদিসটি আলী বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দিল্লাহ এর সুত্রে ও এসেছে-

) من طريق علي بن محمد بن عبدالله المعدل أخبرنا أبو الحسن علي بن محمد بن أحمد المقرئ حدثنا روح بن الفرج حدثنا سعيد بن عفير به.

এখানে বর্ণনাকারী রয়েছেন আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মাদ এবং রাওহ বিন ফারাজ এবং সায়ীদ বিন উফাইর।

রেফারেন্সঃ
আল মুত্তাফাকু ওয়াল মুতাফাররাক-৫৭৬

এ হাদীসের বর্ণনাকারী গণ সকলেই নির্ভরযোগ্য।

১/ ইবনু লাহি’আহঃ
ইমাম খতীব বাগদাদী বলেন, তিনি সত্যবাদী, নির্ভরযোগ্য, উত্তম চরিত্রবান।
রেফারেন্সঃ
তারীখু বাগদাদ-৬৫২৭

২/ আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মাদ বিন আহমাদঃ
ইমাম খতীব বাগদাদী বলেন,
তিনি বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য।
রেফারেন্সঃ
তারীখু বাগদাদ-৬৪৮৩

৩/ রাওহ বিন ফারাজ
ইমাম খতীব বাগদাদী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য।
ইমাম কিনদী বলেন, তিনি অধিক নির্ভরযোগ্য ছিলেন।
রেফারেন্সঃ
তাকরীবুত তাহযীব- ১৯৬৭
তাহযীবুল কামাল- ২৩৪১ (১৯৩৭ )

৪/ সায়ীদ বিন উফাইর
ইবনু আদী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য।
আবু হাতিম বলেন, তিনি সত্যবাদী।
রেফারেন্সঃ
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা- আত তাবাকাতুস সানিয়াহ আশারা

৫/ আবুল আসওয়াদ
ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি একজন তাবেয়ী এবং নির্ভরযোগ্য।
রেফারেন্সঃ
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা-আত তাবাকাতুর রাবি’আহ।

৬/ আলী বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দিল্লাহ
ইমাম খতীব বাগদাদী বলেন, তিনি সত্যবাদী।
রেফারেন্সঃ
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা-
আত তাবাকাতুস সানিয়াহ ওয়াল ইশরূন

বিঃদ্রঃ

ইবনু লাহি’আহ এর জীবনে একটি ঘটনা ঘটেছিল। তার কিতাবাদি পুড়ে গিয়েছিল এজন্য মুহাদ্দিসগণ বলেন, ঘটনাটি ঘটার আগে যারা তার নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সহীহ। এবং ঘটনাটির পর যারা তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদের ঐ বর্ণনাগুলো দুর্বল।
আমাদের আলোচ্য হাদিসটি সায়ীদ বিন উফাইর (রাহ) ইবনু লাহি’আহ থেকে কিতাবাদি পুড়ে যাবার আগেই বর্ণনা করেছিলেন। এমনটাই বলেছেন, ইমাম ইবনু সায়্যিদিন নাস (রাহ)। সুতারাং হাদীসটি সহীহ।
রেফারেন্সঃ
আন নাফখুশ শাযি ফী শারহি জামিইত তিরমিযি- ৮০৪-২/৭৯৯

একই অর্থের হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে :-

فقد أخرجهُ أَبُو نعيم عَن مُحَمَّد بن حبَان ، عَن أبي بكر بن أبي عَاصِم ، عَن مُحَمَّد بن أبي بكر الْمقدمِي ، عَن يزِيد بن عبد الله ، ثَنَا عبد الله بن أبي الْحَوْرَاء أنَّه سمع سعيد بن جُبَير عَن ابْن عَبَّاس رَضِيَ اللَّهُ عَنْهما أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قَالَ : «لِأَن أُصَلِّي (رَكْعَتَين) بِسِوَاكٍ أَحَبُّ إَلَيَّ مِنْ أنْ أُصَلِّي (سَبْعِين) رَكْعَة بِغَيرِ سِوَاكٍ»

হযরত ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মেসওয়াক বিহীন ৭০ রাকাত সালাত আদায় করা থেকে মেসওয়াক করে দু রাকাত সালাত আদায় করা আমার নিকট অধিক প্রিয়।

ইমাম ছাখাওয়ী (রাহ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত এ হাদীসটির সনদ ভাল। অর্থাৎ হাদীসটি সহীহ। ইমাম মুনযিরী (রাহ) ও একই কথা বলেছেন তার আত তারগীব ওয়াত তারহীব নামক গ্রন্থে। ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী ও এটাকে সমর্থন করেছেন।

রেফারেন্সঃ
আল মাকাসিদুল হাসানাহ-২/৪২৪

সনদ পর্যালোচনা-

১/মুহাম্মাদ বিন হিব্বান। তিনি মশহুর ইমাম।নির্ভরযোগ্য।

২/আবু বাকর বিন আবী আসিম। ইমাম আবু হাতিম রাযী (রাহ) বলেন, তিনি সত্যবাদী। আল জারহু ওয়াত তা’দীল-১২০

৩/মুহাম্মাদ বিন আবী বাকর আল মুকাদ্দামী।ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য।
[* সিয়ারু আ’লামিন নুবালা,
* আত তাবাকাতুস সানিয়্যাতা আশারাহ ]

৪/ইয়াযিদ বিন আব্দিল্লাহ।ইমাম ইবনু হিব্বান বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য। কিতাবুস সিকাত-১৬৪০৫

৫/আব্দুল্লাহ বিন আবিল হাওরা। উনি মূলত আব্দুল্লাহ বিন আবিল জাওযা। ইমাম ইবনু হিব্বান বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য। কিতাবুস সিকাত-৯৩৯২

আরো প্রমাণ রয়েছে। সংক্ষেপ করতে গিয়ে সেগুলো আর উল্লেখ করা হলোনা।
আশা করি আর বলার অপেক্ষা রাখছেনা যে, এসকল সুত্রে বর্ণিত হাদিসটি সহীহ। জাল তো দূরের কথা।

Friday, June 12, 2015

তারাবিহ সালাত ২০ রাকাত (পর্ব ২) :-


প্রথম পর্বের পর থেকে :


২০ রাকাত তারাবীহ সালাতের পক্ষে সহীহ হাদীস ও কিছু অভিযোগের জবাব :-


                   ★ দলিল ২৩:

সালাফীদের অভিযোগ যে এটা জাল হাদিস কারন একজন রাবী দুর্বল :

★ হযরত ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ (রাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত সাইব বিন ইয়াযিদ (রা) থেকে, তিনি বলেন, উমার বিন খাত্তাব (রা) এর যামানায় তাঁরা (সাহাবাগণ সহ অন্যান্যগণ) রামাদান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করতেন।
(হাদীসটি সংক্ষেপিত)
রেফারেন্সঃ
আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী-২/৪৯৬

হাদীসটির পর্যালোচনাঃ
১/ ইমাম নববী (রাহ) তাঁর “আল খুলাসাহ” এবং ‘আল মাজমু’ কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।
রেফারেন্সঃ
আল মাজমু-৪/৩২

২/ ইমাম যায়লায়ী (রাহ) তাঁর ‘নাসবুর রায়াহ’ কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।
রেফারেন্সঃ
নাসবুর রায়াহ-২/১৫৪

৩/ইমাম সুবকী (রাহ) তাঁর ‘শারহুল মিনহাজ’ নামক কিতাবে হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।

৪/ ইমাম ইবনুল ইরাকী (রাহ) তাঁর ‘তারহুত তাছরীব’ কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।
রেফারেন্সঃ
তারহুত তাছরীব-৩/৭১৬

৫/ইমাম আইনী (রাহ) তাঁর ‘উমদাতুল কারী’ কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।
রেফারেন্সঃ
উমদাতুল কারী-৭/১৭৮

৬/ইমাম সুয়ুতী (রাহ) তাঁর ‘আল মাসাবীহু ফী সালাতিত তারাওয়ীহ’ নামক কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।
রেফারেন্সঃ
আল মাসাবীহু ফী সালাতিত তারাওয়ীহ-২৮

৭/ইমাম মুল্লা আলী কারী (রাহ) তাঁর ‘শারহুল মুয়াত্তা’ নামক কিতাবে এটাকে সহীহ বলেছেন।

৮/ ইমাম নীমাওয়ী (রাহ) তাঁর ‘আসারুস সুনান’ নামক কিতাবে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

২০ রাকাতের পক্ষের হাদীসটি নিয়ে আলবানী সাহেবের অভিযোগঃ
________________________________________________
আলবানী বলেন,
হাদীসটির বর্ণনাকারী ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ (রাহ)কে নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (র) বলেছেন, তিনি মুনকারুল হাদীস।
ইমাম যাহাবী বলেছেন, তার রেওয়ায়াতে ইদতেরাব রয়েছে। একবার তিনি বলেছেন, ২১ রাকাতের কথা, আবার অন্যস্থানে তিনি বলেছেন ২৩ রাকাতের কথা। তাই উনার কথা গ্রহনযোগ্য নয়।

আমাদের প্রথম জবাবঃ
__________________________________________________
এ অভিযোগ মোটেও গ্রহনযোগ্য নয়, তবুও তর্কের খাতিরে যদি মেনে ও নেই, তবে এক্ষেত্রে আমাদের জবাব হচ্ছে,
কোন একটি হাদীসের অর্থ যখন সকলের নিকট গ্রহণীয় হয়ে যায়, তখন সে হাদিসের সনদের বিশুদ্ধতার প্রয়োজন হয় না। যেমনভাবে ইয়াযিদ বিন খুসাইফা (রাহ) এর হাদীস। এ হাদীসের অর্থ এতই গ্রহণযোগ্য যে এর সনদের অনুসরণের প্রয়োজন হয় না।

কয়েকটি দালিলিক উদাহরণ দিচ্ছিঃ

ইমাম খাতীব বাগদাদী “কাযা” সংক্রান্ত মুয়ায (রা) এর হাদীস সম্পর্কে বলেন,
‘আহলে ইলম এ হাদিসের অর্থ কবুল করেছেন এবং এর দ্বারা দলীল প্রদান করেছেন’। যদিও এর সনদ বিশুদ্ধ নয়।
রেফারেন্সঃ
১/আল ফাকীহু ওয়াল মুতাফাক্কিহু
২/আত তালখীসুল হাবীর- ৪/৮৩
৩/আল মুগনী-৯/৫৩

ইমাম সুয়ূতী বলেন, কোন হাদিসের সনদ বিশুদ্ধ না হলে যদি মানুষ এর অর্থকে কবুল দ্বারা তালাক্কী করে, তবে সে হাদীসকে সহীহ বলে হুকুম দেয়া হয়।
রেফারেন্সঃ
তাদরীবুর রাওয়ী ফী শারহি তাকরীবিন নাওয়ায়ী- ৬০

ইমাম ইবনু আব্দিল বার ‘আল ইসতিযকার’ নামক কিতাবে বলেন, ইমাম বুখারী (রাহ) ‘বাহর’ এর হাদিসকে (সমুদ্রের পানি পবিত্র) সহীহ বলেছেন, অথচ হাদীস বিশারদগণ এর সনদকে বিশুদ্ধ বলেন নি।
রেফারেন্সঃ
আল ইসতিযকার
ইমাম ইবনু আব্দিল বার।
৫/১৫৭


**ইমাম তিরমিযি (রাহ) বলেন, হযরত উমার এবং আলী (রা) এবং অন্যান্য সাহাবীদের থেকে বর্ণিত ২০ রাকাত তারাবীহ সালাতের উপর অধিকাংশ উলামায়ে কেরামগণ একমত হয়েছেন।
এমন কথাই বলেছেন
ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহ)
ইমাম ইবনুল মুবারাক (রাহ)
ইমাম শাফেয়ী (রাহ), তিনি বলেন, এভাবেই আমি মাক্কা মুকাররামাতে লোকজনকে ২০ রাকাত তারাবীহ সালাত পড়তে দেখেছি।
রেফারেন্সঃ
জামিউত তিরমিযি।
১/শারহুস সুন্নাহ-৪/১২৩
২/আল মাজমু-৪/৩১
৩/মুখতাসারু কিয়ামিল লাইলি ওয়া কিয়ামি রামাদান- ৯৫
৪/ফাতহুল বারী- ৪/২৫৩

***ইমাম ইবনু রাশীদ বলেন,
ইমাম মালিকের দুটি কাওলের একটি, ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী, আহমাদ, এবং আবু দাঊদ (রাহ) সবাই বিতির ব্যতীত ২০ রাকাত তারাবীহ সালাতের পক্ষে রায় প্রদান করেছেন।
রেফারেন্সঃ
বিদায়াতুল মুজতাহিদ ।

***ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রাহ) বলেন, এটা হচ্ছে জমহুর (অধিকাংশ) উলামাদের মত। এবং আমাদের নিকট ও এটাই চুড়ান্ত রায়।

***হাফিয ইবনু ইরাকী (রাহ) ও একই কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন,
২০ রাকাতের এ মতটি ই গ্রহন করেছেন ইমাম আবু হানীফা, শাফেয়ী, আহমাদ এবং জমহুর উলামায়ে কেরাম।
রেফারেন্সঃ
১/তারহুত তাছরীব
২/আল মাজমু-৪/৩১
৩/শারহু মুনতাহাল ইরাদাত-১/২৩১

***ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও একই কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন,
এটা সহীহ সুত্রে প্রমাণিত যে রামাদান মাসে হযরত উবাই বিন কা’ব (রা) মানুষদের নিয়ে ২০ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করতেন, এবং তিন রাকাত বিতির সালাত আদায় করতেন।এবং অনেক উলামায়ে কেরাম এটাকে সুন্নাহ বলে ফতোয়া দিয়েছেন, যেহেতু উবাই বিন কা’ব (রা) মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদেরকে নিয়ে এরকম ২০ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করেছেন। তখন কেউ এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ করেন নি।
রেফারেন্সঃ
মাজমু উ ফাতাওয়া-৩২/১১৩


***ওয়াহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহহাব নজদীর ও একই কথাঃ
“উমার (রা) এর যামানায় উবাই বিন কা’ব (রা) এর ইমামতিতে ২০ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করা হত”।
রেফারেন্সঃ
১/মাজমু উল ফাতাওয়া আল নাজদিয়্যাহ
২/মুখতাসারুল ইনসাফ ওয়াশ শারহিল কাবীর- ১/১৫৭



★★★




আমাদের দ্বিতীয় জবাবঃ
__________________
জি, ইমাম আবু দাউদ থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, ইমাম আহমাদ (রাহ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন। কিন্তু ইমাম যাহাবী বলেছেন, আসরাম (রাহ) এর বর্ণনা থেকে ইমাম আহমাদ (রাহ) তাঁকে সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন।

এছাড়াও যেসকল ইমামগন তাঁকে সিকাহ বলেছেন, তাদের কথা উল্লেখ করছি-
১/ ইমাম আবু হাতিম (রাহ) তাঁকে সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
২/ ইমাম ইবনু হিব্বান নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের নিয়ে লেখা কিতাব ‘কিতাবুস সিকাত’ এ তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন।
৩/ ইবনু মায়ীন (রাহ) বলেছেন, তিনি সিকাহ। তাঁর কথা নির্দ্বিধায় দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
৪/ ইমাম নাসাঈ (রাহ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৫/ ইমাম যাহাবী (রাহ) ‘আল কাশিফ’ নামক কিতাবে তাঁর নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেছেন, বলেছেন, তিনি সিকাহ।
৬/ ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রাহ) তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৭/ ইমাম ইবনু শাহিন (রাহ) তাঁকে কখনো বলেছেন, তিনি নির্ভরযোগ্য। আবার কখনো বলেছেন, আমি তাঁকে ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানিনা।

বিস্তারিত জানতে রেফারেন্সগুলো দেখুন-
১/ তারীখু আসমা ইস সিফাত-২৫৬-২৫৮
২/ মীযানুল ই’তিদাল-৪/৪৩০
৩/ তাকরীবুত তাহযীব- ২/৩৬৪-৩৬৭

আর ইমাম আহমাদের একটি মন্তব্য যে, ইয়াযিদ বিন খুসাইফা (রাহ) মুনকারুল হাদীস যা আলবানী সাহেব উল্লেখ করে এবং কারণ দেখিয়ে ঐ হাদিসটিকে বাতিল বলে ঘোষনা দিলেন, তাঁর জবাব আমরা ইবনু হাজার আসকালানী (রাহ) এর একটি কাওল দিয়ে প্রদান করবো।
ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রাহ) এ বর্ণনাটি উল্লেখ করে বলেন, মূলতঃ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহ) ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ (রাহ) এর ব্যাপারে ‘মুনকারুল হাদীস’ এজন্যই বলেছেন, কারণ ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ (রাহ) ছিলেন হাদীসের ব্যাপারে তাঁর সমকালীনদের চেয়ে ব্যতিক্রম। আর এ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম আহমাদ (রাহ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস হিসেবে মন্তব্য করেছেন। এখানে তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর কোন সমালোচনা করেননি।
রেফারেন্সঃ
১/ হাদয়্যুস সারী -৪৩৭-৪৫৩
২/ আর রাফউ ওয়াত তাকমীল-১৪৫
৩/ লিসানুল মুহাদ্দিসীন-৫/১৯৪

আলবানীর অভিযোগঃ হাদীসে ইদতেরাব বিদ্যমান
____________________________________
আলবানী সাহেব ২০ রাকাত তারাবীহ সংক্রান্ত হাদীসকে দুর্বল প্রমাণ করতে গিয়ে বলেছেন, ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ তো একেক সময় একেক কথা বলেছেন, কখনো বলেছেন, তারাবীহ সালাতের রাকাত ২১, আবার কখনো বলেছেন-২৩। সুতরাং তাঁর এমন অবস্থার কারণে তাঁর বর্ণনার হাদীস গ্রহনযোগ্য নয়। বরং ১১ রাকাত তারাবীহ সালাতের হাদীসটিই সহীহ।


আমাদের জবাবঃ
____________
এক্ষেত্রে আমরা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রাহ) এর কথা দিয়ে জবাব দিতে পারি, আর তা হচ্ছে, ২১ আর ২৩- এ সংখ্যার পার্থক্য মূলতঃ তারাবীহ সালাতের সংখ্যার ব্যাপারে নয়, বরং এটা হচ্ছে বিতির সংক্রান্ত। অর্থাৎ তিনি তাঁরা কখনো বিতির পড়েছেন ১ রাকাত, আবার কখনো তিন রাকাত। আর এ কারনেই ২১ এবং ২৩ রাকাতের কথা ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ (রাহ) উল্লেখ করেছেন।
রেফারেন্সঃ
ফাতহুল বারী-৪/২৫৩

আর এমন ইদতিরাব কোন হাদীসকে দুর্বল বানাতে পারেনা।
রেফারেন্সঃ
তাদরীবুর রাবী-১/২৬৫

তাছাড়া এটাকে যদি বড় ইস্যু ধরা হয়, তাহলে আলবানী সাহেব নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা খাবেন। এটা অবশ্য একটা মজার কথা।
কীভাবে?
আলবানী সাহেব ১১ রাকাত তারাবীহ সালাতের পক্ষে যে হাদীসের প্রশংসা করতে করতে পেরেশান, সে হাদীসের বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ (রাহ) ও কিন্তু একই কাজ করেছেন! এক রেওয়ায়াতে তিনি বলেছেন ১১ রাকাত, আবার অন্য রেওয়ায়াতে বলেছেন, ১৩ রাকাত!!
বিস্তারিত দেখুন-
মুসান্নাফু আব্দির রাযযাক-৪/২৬০


সাহাবায়ে কেরামের আমল নিয়ে আরেকটি কথা বলে শেষ করছি-
ইমাম আতা বিন আবী রাবাহ (রাহ) বলেন- আমি সাহাবায়ে কেরামকে রামাদান মাসে ২০ রাকাত তারাবী সালাত এবং তিন রাকাত বিতির আদায় করতে পেয়েছি।
রেফারেন্সঃ
১/মুখতাসারু কিয়ামিল লাইলি ওয়া কিয়ামি রামাদান- ৯৫
২/ ফাতহুল বারী-৪/২৫৩

ইমাম আতা (রাহ) হচ্ছেন একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী। তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
রেফারেন্সঃ
তাকরীবুত তাহযীব-২/২২





___________________________________

মিস্টার আলবানী সাহেবের গুরুতর অভিযোগঃ
___________________________________

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১১ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করেছেন। এটাই সীমাবদ্ধ। এ সংখ্যাই নির্দিষ্ট। তাই এর থেকে বেশী তারাবীহ সালাত আদায় করা হারাম।
রেফারেন্সঃ
সালাতুত তারাবীহঃ পেইজ নাম্বার-২৫

আমাদের জবাবঃ


অথচ তাদের সবার গুরু ইবনে তাইমিয়া বলেন,
আর যে ব্যক্তি ধারণা করলো যে, তারাবীহ সালাতের নির্ধারিত সংখ্যা রয়েছে, এ সংখ্যা থেকে বাড়ানো বা কমানো যাবেনা, সে ব্যক্তি ভুল করলো।
রেফারেন্সঃ
মাজমু উ ফাতাওয়া-২/৪০১


____________
মিস্টার আলবানীর এ কথাটিই প্রমাণ করছে, তিনি একজন জাহিল ছিলেন। হাদীসের পর্যাপ্ত জ্ঞান তার ছিলনা। অথবা উনি মানসিক অসুস্থ।কোন সুস্থ মাথার আলেম এমন কথা বলতে পারেনা, অসম্ভব।
আমার এ কথার সত্যতা নিম্নপ্রদত্ত দলীলসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ।

১/ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ ১১ রাকাত সালাত আদায় করার আগে অন্যান্য নফল সালাত আদায় করতেন।
দলীল উপস্থাপনা -
***হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার সালাত আদায় করে আমার ঘরে প্রবেশ করতেন এবং চার রাকাত অথবা ছয় রাকাত সালাত আদায় করতেন।
রেফারেন্সঃ
আবু দাউদ-১৩০৩
***হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে যখন নফল সালাত আদায় করার জন্য ঘুম থেকে উঠতেন, তখন তিনি দু রাকাত হালকা সালাত (খাফীফাহ) আদায় করতেন।
রেফারেন্সঃ
সহীহ মুসলিম/৭৬৫-৭৬৭

***হযরত আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে উঠে সে যেন দু রাকাত হালকা সালাত (নফল) আদায় করে নেয়।
রেফারেন্সঃ
সহীহ মুসলিম/৭৬৮

মনে রাখতে হবে, এ সালাত সমূহ ঐ ১১ রাকাত থেকে বেশী।
রেফারেন্সঃ
সালাতুত তারাওয়ীহি আকছারা মিন আলফি আম/২০
যাদুল মা’আদ-১/৩২৫-৩২৭

***হযরত আবু সালামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা)কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি জবাব দিলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১৩ রাকাত সালাত আদায় করতেন।
রেফারেন্সঃ
সহীহ মুসলিম/৭৩৮-১২২০

তাহলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে গেল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সালাতের নির্ধারিত সংখ্যা নেই। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংখ্যায় তিনি সালাত আদায় করেছেন।



★★★ ১১ রাকাতের হাদীস নিয়ে কিছু কথাঃ
_________________________

হাদীসঃ
আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত,তিনি আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন ,রামাদান মাসে রাসুল (সাঃ) এর নামাজ কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন, রাসুল (সাঃ) রমজানে ও অন্যান্য মাসে বিতির সহ এগার রাকআতের বেশী পড়তেন না।
-সহীহ আল বুখারী।

পর্যালোচনা-
মূলতঃ এগারো রাকাতের সালাত তারাবীহ সালাত ছিলনা। এটা ছিল তাহাজ্জুদের সালাত। কারন-

১/ ইমাম বুখারী হাদীসটিকে তাহাজ্জুদের সালাতের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।
কিতাবুত তাহাজ্জুদ
বাবু কিয়ামিন নাবিয়্যি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বিল লাইলি ফী রামাদানা ওয়া গাইরিহী।
২/ইমাম মুসলিম সালাতুল লাইল (তাহাজ্জুদ) এর অধ্যায়ে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
অধ্যায়ের নামঃ বাবু সালাতিল লাইল
৩/ ইমাম তিরমিযি জামিউত তিরমিযিতে ও একইভাবে উল্লেখ করেছেন।
অধ্যায়ের নামঃবাবু মা জাআ ফী ওয়াসফি সালাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
৪/ইমাম আবু দাঊদ সুনানু আবী দাউদে হাদীসটিকে তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।
অধ্যায়ের নামঃ আবওয়াবু কিয়ামিল লাইল।
৫/ইমাম নাসাঈ সুনানু নাসাঈতে হাদীসটিকে তাহাজ্জুদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
দেখুন, কিতাবু কিয়ামিল লাইলি ওয়া তাতাওউইন নাহার।


এই পর্বটি গৃহীত হয়েছে : কলম সৈনিক থেকে।



Friday, May 29, 2015

রুকু থেকে দাঁড়ানোর অবস্থায় এবং দুই সিজদার মাঝে বসা অবস্থায় দুআ :-


রুকু থেকে উঠার সময় ইমাম যখন
 سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه  
বলবে তখন মুক্তাদীর জন্য
 رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বলা উত্তম। অতপর সম্ভব হলে-
حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيْهِ দুআটিও পড়া উত্তম।

★ কেননা হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
ইমাম যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه বলবে তোমরা তখন رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বল।

★ অন্য এক হাদীসে আছে, রিফাআ ইবনে রাফে রা. বর্ণনা করেন যে, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে নামায আদায় করছিলাম। তিনি রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে যখন
سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه বললেন তখন পিছন থেকে এক ব্যক্তি বলে উঠল رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيْهِ   নামায শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামাযে ঐ বাক্য কে বলেছে? এক ব্যক্তি বলল, আমি, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি দেখতে পেলাম ত্রিশের অধিক ফেরেশতা উক্ত দুআর ছাওয়াব নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত যে, কে আগে তার ছাওয়াব লিখবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৯৯

আর দুই সিজদার মাঝে রাবিবগ ফিরলী এবং  اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَعَافِنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي পড়া উত্তম।


   সুনানে নাসায়ীতে দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে ‘রাবিবগফিরলী, রাবিবগফিরলী’ দুআটি পড়ার কথা এসেছে। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে তা পড়তেন।-সুনানে নাসায়ী ১/২৯
আবার কখনো তিনি এ দুআটিও পড়তেন- اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَعَافِنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৮৫০


ফযীলতপূর্ণ এ দুআগুলো ইমাম-মুকতাদী সবার জন্য নফল-ফরয সব নামাযেই পড়া উত্তম। আর নফল ও তাহাজ্জুদে উপরোক্ত দুআ ছাড়াও আরো কিছু দুআ পড়ার কথা হাদীস শরীফে এসেছে। যেমন-রুকু থেকে উঠে নিম্নোক্ত দুআগুলো পড়ার কথা হাদীসে এসেছে। সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকু থেকে দাঁড়িয়ে পড়তেন-

اللهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ، مِلْءُ السَّمَاوَاتِ والْأَرْضِ، وَمَا بَيْنَهُمَا، وَمِلْءُ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

অন্য বর্ণনায় এ দুআটি পড়ার কথাও এসেছে-

اللهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ مِلْءُ السَّمَاءِ، وَمِلْءُ الْأَرْضِ، وَمِلْءُ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ اللهُمَّ طَهِّرْنِي بِالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَالْمَاءِ الْبَارِدِ اللهُمَّ طَهِّرْنِي مِنَ الذُّنُوبِ وَالْخَطَايَا، كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْوَسَخِ

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪৭৬

আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণনায় সহীহ মুসলিমে এ দুআটিও এসেছে-

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَمِلْءُ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ، أَحَقُّ مَا قَالَ الْعَبْدُ، وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدٌ: اللهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ، وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪৭৭

ফকীহগণের ভাষ্যমতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল দীর্ঘ দীর্ঘ দুআগুলো সাধারণত তাহাজ্জুদ ও নফল নামাযে পড়তেন। তাই এ দুআগুলো বিশেষভাবে নফল নামাযে পড়া উত্তম।

Wednesday, May 27, 2015

ওযুতে গর্দান মাসেহ করা মুস্তাহাব, বেদায়াত নয় :


ওযুতে গর্দান মাসেহ করা মুস্তাহাব

************************


★ ১ম দলিলঃ

فَإِنَّ عَلِيَّ بْنَ ثَابِتٍ , وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ حَدَّثَانَا عَنِ الْمَسْعُودِيِّ، عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ مُوسَى بْنِ طَلْحَةَ , قَالَ: ্রمَنْ مَسَحَ قَفَاهُ مَعَ رَأْسِهِ وُقِيَ الْغُلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِগ্ধ (كِتَابُ الطَّهُورِ لِأَبِي عُبَيْدٍ الْقَاسِمِ بْنِ سَلَّامٍ الْخُزَاعِيِّ)

হযরত মুসা বিন তালহা রহ. বলেন: যে ব্যক্তি মাথার সাথে তার গর্দান মাসেহ করবে সে কিয়ামতের দিন (গলায়) বেড়ী পরানো থেকে রেহাই পাবে। (কিতাবুত তুহুর লিআবি উবায়েদ-৩৬৮, পৃষ্ঠা-৩৭৪)। হাফেজ ইবনে হাজার রহ.ও তালখীছুল হাবীরে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (তালখীছুল হাবীর-৯৮ নং হাদীসের আলোচনায়)

★ সনদের আলোচনাঃ
———
সনদ হিসেবে হাসান। উল্লিখিত হাদীসের রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। কেবল মাসউদীকে নিয়ে এতটুকু আপত্তি পাওয়া যায় যে, শেষ বয়সে তাঁর স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু উক্ত অভিযোগ এ কারণে ক্ষতিকর হবে না যে, আবু হাতিমের বর্ণনানুযায়ী তাঁর মৃত্যুর এক বা দুই বছর পূর্বে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। আর তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পূর্বে আব্দুর রহমান বিন মাহদী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন; কিন্তু তখন তাঁকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। (তাহজীবুত তাহজীব: ৩৯১৯)।

তাহলে বুঝা যায়, আব্দুর রহমান তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার পূর্বেই। সুতরাং এ বর্ণনায় কোন সমস্যা নেই।




★ ২য় দলিল :-

হযরত আবু উবায়েদ এ হাদীসটি আরও একটি সনদে বর্ণনা করেছেন যা নিচে প্রদত্ব হলো-

حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ، قَالَ: أَخْبَرَنَا أَبُو عُبَيْدٍ قَالَ: ثنا حَجَّاجٌ، عَنِ الْمَسْعُودِيِّ، عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّهُ قَالَ مِثْلَ ذَلِكَ

(তালখীছুল হাবীর, হাদীস নং-৩৬৯)

★ সনদের আলোচনা
————
ইবনে হাজার রহ. তালখীছুল হাবীর-৯৮ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:

قُلْتُ : فَيَحْتَمِلُ أَنْ يُقَالَ : هَذَا وَإِنْ كَانَ مَوْقُوفًا فَلَهُ حُكْمُ الرَّفْعِ ، لِأَنَّ هَذَا لَا يُقَالُ مِنْ قِبَلِ الرَّأْيِ ، فَهُوَ عَلَى هَذَا مُرْسَلٌ

এ হাদীসটি যদিও মাওকুফ তবু মারফু’র হুকুম রাখে। কারণ, এটা এমন একটি বিষয় যা বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে বলা যায় না (বরং রসূলুল্লাহ স. থেকে জেনেই বলতে হয়)। এতদসত্ত্বেও (সাহাবার নাম নাম উল্লেখ না থাকায়) হাদীসটি মুরসাল। ইবনে হাজার রহ. শরহু নুখবাতিল ফিকারে বলেন, ثقةٌ (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের মুরসাল বর্ণনার পক্ষে কোন সমার্থক বর্ণনা পাওয়া গেলে চার ইমামের নিকটেই তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। (সারসংক্ষেপ: শরহু নুখবাতিল ফিকার: ৫০-৫১)

★ ৩য় দলিলঃ

وَأَخْبَرَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ أَخْبَرَنَا أَبُو الْقَاسِمِ بْنُ عَمْرٍو حَدَّثَنَا أَبُو حَصِينٍ حَدَّثَنَا يَحْيَى حَدَّثَنَا أَبُو إِسْرَائِيلَ عَنْ فُضَيْلِ بْنِ عَمْرٍو عَنْ مُجَاهِدٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ : أَنَّهُ كَانَ إِذَا مَسَحَ رَأْسَهُ مَسَحَ قَفَاهُ مَعَ رَأْسِهِ. هَذَا مَوْقُوفٌ وَالْمُسْنَدُ فِى إِسْنَادِهِ ضَعْفٌ وَاللَّهُ أَعْلَمُ

হযরত ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত: তিনি যখন মাথা মাসেহ করতেন তখন মাথার সাথে গর্দানও মাসেহ করতেন। (সুনানে বাইহাকী: ২৮২)

★ সনদের আলোচনাঃ
————-
মাওকুফ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। ইমাম বাইহাকী রহ. এ হাদীসটিকে মুসনাদ তথা মারফু’ হিসেবে জঈফ বলেছেন; তবে মাউকুফ হিসেবে কোন আপত্তি করেননি। যার অর্থ হল মাউকুফ হিসেবে এটা অগ্রহণযোগ্য নয়।

★ ৪র্থ দলিল :-

حَدَّثنا إبراهيم بن سَعِيد، قَال: حَدَّثنا مُحَمد بْنُ حُجْر، قَالَ: حَدَّثني سَعِيد بْنُ عَبد الْجَبَّارِ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْر، عَن أَبيهِ، عَن أُمِّهِ عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْر، رَضِي اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ شَهِدْتُ النَّبِيّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيه وَسَلَّم وَأُتِيَ بِإِنَاءٍ فِيهِ مَاءٌ فَأَكْفَأَهُ عَلَى يَمِينِهِ ثَلاثًا …..ثُمَّ مَسَحَ عَلَى رَأْسِهِ ثَلاثًا وَظَاهِرَ أُذُنَيْهِ ثَلاثًا وَظَاهِرَ رَقَبَتِهِ

হযরত ওয়াইল বিন হুজর (রা). বলেন, আমি দেখেছি যে, রসূলুল্লাহ স.-এর জন্য পানির পাত্র আনা হলো। তিনি তা থেকে তিনবার ডান হাতের উপর ঢাললেন। ….অতঃপর মাথা, কান ও গর্দানের উপরিভাগ তিনবার করে মাসেহ করলেন। (মুসনাদে বাঝ্ঝার-৪৪৮৮)।

★ সনদের আলোচনাঃ
————-
জঈফ।



★ ৫ম দলিলঃ

عَنْ فُلَيْحِ بْنِ سُلَيْمَانَ عَنْ نَافِعٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: “مَنْ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ بِيَدَيْهِ عَلَى عُنُقِهِ وُقِيَ الْغُلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ” وَقَالَ هَذَا إنْ شَاءَ اللَّهُ حَدِيثٌ صَحِيحٌ. قُلْتُ: بَيْنَ ابْنِ فَارِسٍ وَفُلَيْحٍ مَفَازَةٌ فَيُنْظَرُ فِيهَا.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. বলেন, রসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অযু করলো আর উভয় হাত দ্বারা আপন গরদান মাসেহ করলো তাকে কিয়ামতের দিন (গলায়) বেড়ী পরানো থেকে রেহাই দেয়া হবে। (আল্লামা রুইয়ানী বলেন, ইংশাআল্লাহ হাদীসটি সহীহ। (তালখীছুল হাবির: ৯৮ নম্বর হাদীসের আলোচনায়)

★ সনদের আলোচনাঃ
————
সনদ জানা যায়নি।

★ হাফেজ ইবনে হাজার রহ বলেন ইবনে ফারেস এবং ফুলইহ-এর মধ্যে দীর্ঘ দুরত্ব রয়েছে তাই বিশুদ্ধতার বিষয়টি আরও ভাবা উচিত।

উপরোক্ত ৫টি হাদীসের মধ্যে প্রথম দুটি মুরসাল রেওয়াত।
আর সহীহ মুরসাল রেওয়াত ইমাম আবু হানিফা ,
ইমাম মালেক রাহঃ এর নিকট হুজ্জত।
আর ইমাম শাফী রাহঃ এর কাছে শর্ত সাপেক্ষে হুজ্জত।
আর তার শর্ত হল মুরসাল রেওয়াতের সাথে অন্য রেওয়ায়েত থাকা জরুরী।

আর প্রথম মুরসাল রেওয়াতের সাহেদ হিসেবে আমরা আরো ৪ টি রেওয়েত বর্ণনা করেছি। আর অন্য হাদীসের সনদগুলো স্বতন্ত্রভাবে দুর্বল হলেও পারস্পারিক সমর্থনের কারণে সম্মিলিতভাবে যে শক্তি সৃষ্টি হয়েছে মুহাদ্দিসীনে কিরাম সেটাকে হাসান লিগায়রিহী বলে থাকেন। যেমনটি বলেছেন শায়খ আব্দুল হক রহ. মিশকাত শরীফের ভুমিকায়। (মুকাদ্দামায়ে মেশকাত,পৃষ্ঠা- ৫ ও ৬)।


★ ইমাম আহমাদ রহ.-এর আমল :-

وَذَكَرَ الْقَاضِي وَغَيْرُهُ أَنَّ فِيهِ رِوَايَةً أُخْرَى: أَنَّهُ مُسْتَحَبٌّ. وَاحْتَجَّ بَعْضُهُمْ أَنَّ فِي خَبَرِ ابْنِ عَبَّاسٍ: ্রامْسَحُوا أَعْنَاقَكُمْ مَخَافَةَ الْغُلِّগ্ধ . وَاَلَّذِي وَقَفْت عَلَيْهِ عَنْ أَحْمَدَ فِي هَذَا، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ قَالَ: رَأَيْت أَبِي إذَا مَسَحَ رَأْسَهُ وَأُذُنَيْهِ فِي الْوُضُوءِ مَسَحَ قَفَاهُ. [فَصْل مَا يُسْتَحَبّ فِي الْوُضُوء]

অনুবাদ : কাজী আবু ইয়া’লা রহ.সহ অন্যান্য মনিষিগণ বলেন, গর্দান মাসেহ করা মুসতাহাব মর্মে আরও একটি বর্ণনা রয়েছে। আবার কেউ কেউ দলীল পেশ করেছে যে, ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদীসে রয়েছে যে, বেড়ী পরানোর আশংকায় তোমরা গর্দান মাসেহ কর। এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ থেকে আমি যা জানতে পেরেছি তা এই যে, ইমাম আহমাদ রহ.-এর ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে দেখেছি অযুতে যখন তিনি মাথা এবং কান মাসেহ করতেন তখন গর্দানও মাসেহ করতেন। (আল মুগনী লিইবনে কুদামা, অযুর মুস্তাহাব অধ্যায়)।

শেষ কথা হল-
★ হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত মারফু’ হাদীস (তারীখে আসফাহান, মুসনাদে ফেরদাউস),

★ হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত মাউকুফ হাদীস (সুনানে বাইহাকী, ইবনুল ফারেস),

★ বিশিষ্ট তাবিঈ হযরত মুসা বিন তলহার আছার (কিতাবুত তুহুর লিআবি উবায়েদ),

★ শাফেঈ মাজহাবের ইমামগণের মধ্যে আল্লামা বাগাবী (রাফেঈ আল কাবীর),

*** রুয়ানী (রাফেঈ আল কাবীর),
***  ইবনে হাজার আসকালানী (তালখীছুল হাবীর),

★ হানাফী মাজহাবের ইমামগণ থেকে :-

*** আল্লামা আইনী (আল বিনায়াহ),
*** মুল্লা আলী কারী, (আল মাউযুআতুল কুবরা)

★ হাম্বলী মাজহাবের ইমাম হযরত আহমাদ বিন হাম্বল, (মুগনী লিইবনে কুদামা),

★ বিশিষ্ট গায়রে মুকাল্লিদ আলেম আল্লামা শাওকানী (নাইলুল আওতার)
প্রমুখসহ অসংখ্য মুহাদ্দিসীনে কিরাম গর্দান মাসেহ করার আমল গ্রহণ করেছেন।

★ মোল্লা আলী কারী রহ. বলেন :-

حَدِيثُ مَسْحُ الرَّقَبَةِ أَمَانٌ مِنَ الْغُلِّ : قَالَ النَّوَوِيُّ فِي شَرْحِ الْمُهَذَّبِ إِنَّهُ مَوْضُوعٌ : قُلْتُ لَكِنْ رَوَاهُ أَبُو عُبَيْدِ

الْقَاسِمِ عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ مُوسَى بْنِ طَلْحَةَ قَالَ مَنْ مَسَحَ قَفَاهُ مَعَ رَأْسِهِ وُقِيَ مِنَ الْغُلِّ

وَالْحَدِيثُ مَوْقُوفٌ إِلَّا أَنَّهُ فِي الْحُكْمِ مَرْفُوعٌ لِأَنَّ مِثْلَهُ لَا يُقَالُ بِالرَّأْيِ وَيُقَوِّيهِ مَا رُوِيَ مَرْفُوعًا مِنْ مُسْنَدِ

الْفُرْدَوْسِ مِنْ حَدِيثِ ابْنِ عُمَرَ لَكِنَّ بِسَنَدٍ ضَعِيفٍ وَالضَّعِيفُ يُعْمَلُ بِهِ فِي فَضَائِلِ الْأَعْمَالِ اتِّفَاقًا وَلَذَا قَالَ

أَئِمَّتُنَا إِنَّ مَسْحَ الرَّقَبَةِ مُسْتَحَبٌّ أَوْ سُنَّةٌ

অনুবাদ : গর্দান মাসেহ করা বেড়ী থেকে নিরাপদ (হাদীস)। ইমাম নববী শরহুল মুহাজ্জাবে বলেন, এটা মাউযু’। (মুল্লা আলী কারী রহ.) বলেন, আবু উবায়েদ কাসেম সূত্রে মুসা বিন তলহা থেকে বর্ননা করেন, যে ব্যক্তি মাথার সাথে তার গর্দান মাসেহ করবে সে কিয়ামতের দিন (গলায়) বেড়ী পরানো থেকে রেহাই পাবে। হাদীসটি যদিও মাউকুফ তবে মারফু’-এর শ্রেণীভুক্ত। কারণ এরকম বিষয়ে বিবেক খাটিয়ে কিছু বলা যায় না। এ হাদীসটিকে আরও শক্তিশালী করে মুসনাদে ফিরদাউসে ইবনে উমর থেকে জঈফ সনদে বর্ণিত মারফু’ হাদীস। আর ফজিলতের ক্ষেত্রে জঈফ হাদীস সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য। এ কারণে আমাদের ইমামগণ বলেন, গর্দান মাসেহ করা সুন্নাত বা মুস্তাহাব। (আল মাউযুআতুল কুবরা-৪৩৪)।




বিপদে আপদের সময় যেসব দোয়া পড়বেনঃ

বিপদ-মসিবতে পাঠ করার জন্য কতিপয় দোয়া  এবং এর জন্য আমল: ♦১) উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও...