মানুষের জীবন সময়ের সমষ্টি। সময়কেমানুষের প্রয়োজনে ব্যবহারোপযোগীকরে আল্লাহ তাআলা প্রাকৃতিকভাবেবিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন। যেমন:দিন, রাত, মাস, বছর ইত্যাদি। বছরকেআমরা সাল বা সনও বলি। বছর শব্দটিরমূল হলো উর্দু বরছ, সাল শব্দটি ফারসিএবং সন শব্দটি আরবি; বাংলায় বর্ষ,বৎসর ও অব্দ ব্যবহৃত হয়।
★ আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী
পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর
বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায়
মাস বারোটি, তন্মধ্যে চারটি
নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত
বিধান।’ (সূরা: তওবা, আয়াত: ৩৬)।
★ ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে
জ্যোতির্ময় করেছেন এবং উহাদের
মনজিল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে
তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব
জানতে পারো। আল্লাহ ইহা নিরর্থক
সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের
জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে
বিবৃত করেন।’ (সূরা: ইউনুস, আয়াত: ৫)।
★ ‘আর সূর্য ভ্রমণ করে উহার নির্দিষ্ট
গন্তব্যের দিকে, ইহা পরাক্রমশালী
সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য
আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন
মনজিল; অবশেষে উহা শুষ্ক বক্র
পুরোনো খর্জুর শাখার আকার ধারণ
করে।’ (সূরা: ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮-৩৯)।
প্রাচীন আরবে সুনির্দিষ্ট কোনো সনপ্রথা প্রচলিত ছিল না। বিশেষ ঘটনারনামে বছরগুলোর নামকরণ করা হতো।যেমন বিদায়ের বছর, অনুমতির বছর,হস্তীর বছর ইত্যাদি। ইসলামেরদ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) যখনখেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন,তখন বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নতুন নতুনরাষ্ট্র ও ভূখণ্ড ইসলামি খেলাফতেরঅন্তর্ভুক্ত হয়। রাষ্ট্রের জরুরিকাগজপত্র ইত্যাদিতেও কোনো সন-তারিখ উল্লেখ না থাকায় অসুবিধাহতো। ঐতিহাসিক আল-বেরুনি কর্তৃকবিধৃত একটি বিবরণী থেকে জানা যায়যে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু মুসাআশআরী (রা.) একটি পত্রে উমর (রা.)-এর কাছে অভিযোগ করেন, ‘আপনিআমাদের কাছে যেসব চিঠিপাঠাচ্ছেন, সেগুলোতে কোনো সন-তারিখের উল্লেখ নেই, যার কারণেআমাদের অনেক অসুবিধা হয়।’ বিষয়টিরগুরুত্ব অনুধাবন করে খলিফা হজরত উমর(রা.) একটি সন চালুর ব্যাপারে সচেষ্টহন। প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদআল্লামা শিবলী নোমানী (রা.)হিজরি সনের প্রচলন সম্পর্কে তাঁরসুপ্রসিদ্ধ আল ফারুক গ্রন্থে উল্লেখকরেন: হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে১৬ হিজরি সনের শাবান মাসে খলিফাউমরের কাছে একটি দাপ্তরিক পত্রেরখসড়া পেশ করা হয়, পত্রটিতে মাসেরউল্লেখ ছিল; সনের উল্লেখ ছিল না।তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফাজিজ্ঞাসা করেন, পরবর্তী কোনোসময়ে তা কীভাবে বোঝা যাবে যেএটি কোন সনে তাঁর সামনে পেশ করাহয়েছিল? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তরনা পেয়ে হজরত উমর (রা.) সাহাবায়েকেরাম ও অন্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে এক আলোচনা সভারআয়োজন করেন। এই ঐতিহাসিকসিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর১০ জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬৩৮খ্রিষ্টাব্দে। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ
দেন হজরত আলী (রা.)।
তৎকালে আরবে অনুসৃত প্রথা অনুযায়ীপবিত্র মহররম মাস থেকেই ইসলামি বর্ষশুরু (হিজরি সনের শুরু) করার এবংজিলহজ মাসকে সর্বশেষ মাস হিসেবেনেওয়ার পরামর্শ দেন হজরত উসমান(রা.)। (বুখারি ও আবু দাউদ)।
হিজরি সন মূলত চান্দ্রবর্ষনির্ভর।চান্দ্রমাস ২৯ ও ৩০ দিনে হয় বিধায় ৩৫৪বা ৩৫৫ দিনে বর্ষ পূর্ণ হয়। তাইচান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষে সাধারণত ১০ বা১১ দিনের পার্থক্য হয়। আরব, ইরানসহবিভিন্ন দেশে হিজরি সৌরবর্ষওপ্রচলিত আছে।হিজরতরাসুলে পাক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এরমক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায়হিজরতের ঘটনা মুসলমানদের জন্য বেশগুরুত্বপূর্ণ। সেদিকে লক্ষ করেই ইসলামিসন প্রবর্তন করা হয়, যাকে ‘হিজরি সন’বলা হয়। হিজরত মানে ছেড়ে যাওয়া,পরিত্যাগ করা; দেশান্তর হওয়া ওদেশান্তরিত করা। পরিভাষায় হিজরতহলো ধর্মের জন্য এক স্থান ত্যাগ করেঅন্য স্থানে চলে যাওয়া। কামনা-বাসনা বিসর্জন দেওয়া, সংযম অবলম্বনও আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কাম, ক্রোধ,লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য পরিত্যাগকরাই হিজরতের অন্তর্নিহিত দর্শন।
রাসুলে পাক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর
সময় ইসলামের প্রথম হিজরত হয়
আবিসিনিয়ায়। কুরাইশরা যখন
মুসলমানদের জীবনকে অত্যাচারে
নিষ্পেষিত করতে লাগল, তখন রাসুল
(সা.) তাঁদের জীবন ও দ্বীন-ইমান
রক্ষার জন্য আবিসিনিয়ায় হিজরতের
অনুমতি দিলেন। এ হিজরতে অংশ
নিয়েছিলেন নিপীড়িত-নিষ্পেষিত ১৬
জন মুসলমানের একটি দল। হজরত জাফর
ইবনে আবি তালিব (রা.) ঐতিহাসিক
ওই দলের নেতা ছিলেন। ওই সময়
আবিসিনিয়ার বাদশাহ ছিলেন
আসহামা, যাঁর উপাধি ছিল নাজাশি।
তিনি তখনকার প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের
অনুসারী ছিলেন। হজরত জাফর (রা.)
আরবের পরিস্থিতি ও রাসুলুল্লাহ
(সা.)-এর অবস্থা বর্ণনা করলেন, সূরা
মারইয়াম তিলাওয়াত করলেন এবং
হজরত ঈসা (আ.) ও মারইয়াম (আ.)
সম্পর্কে ইসলামের আকিদা–বিশ্বাস
বর্ণনা করলেন। বাদশাহ এই সত্য শুনে
নিজে ইমান গ্রহণ করলেন এবং
মুসলমানদের রাজদরবারের মেহমান
ঘোষণা করলেন। প্রথম হিজরতটি
নবুয়তের পঞ্চম বছরে সংঘটিত হয়েছিল।
এরপর নবুয়তের সপ্তম বছরে রাসুলে পাক
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবায়ে
কেরাম (রা.)-কে আবার হিজরতের
অনুমতি দিলেন। মুসলমানরা
দ্বিতীয়বারের মতো আবিসিনিয়ায়
হিজরত করলেন। এ হিজরতে ৮৩ জন পুরুষ
আর ১৮ জন নারী শামিল ছিলেন।
মদিনায় হিজরত
হজ ও অন্যান্য উপলক্ষকে কেন্দ্র করে
আরবের মানুষ মক্কা মুকাররমায় আসত।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাদের কাছে
ইসলামের বাণী প্রচার করতেন।
নবুওয়াতের দশম বছরে হজের বিশাল
সমাবেশে কতিপয় মদিনাবাসী রাসুল
(সা.)-এর দাওয়াতে আকৃষ্ট হলেন।
হজরত সাদ বিন যুরারাহ (রা.) ও হজরত
যাকওয়ান বিন আবদি কায়স (রা.)
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ দুজন
ছিলেন আওস গোত্রের। তাঁরা
জানমাল, আত্মীয়স্বজন ইত্যাদির
পরোয়া না করে মদিনায় ব্যাপকভাবে
ইসলাম প্রচার করেন। এক বছর
অতিবাহিত না হতেই সত্যের আলোয়
মানুষের হৃদয় আলোকিত হতে শুরু করল।
পরের বছর হজের মৌসুমে মদিনার
লোকজন মক্কায় এলেন, তাঁদের মধ্য
থেকে ছয় ব্যক্তি প্রকাশ্যে ইসলাম
গ্রহণ করলেন। এরপর তৃতীয় বছর (নবুয়তের
দ্বাদশ বছর) মদিনার ১২ জন ব্যক্তি
রাসুল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে
ইসলাম গ্রহণ করলেন। এর নাম বায়আতে
আকাবায়ে উলা (প্রথম আকাবার শপথ)।
এরপর নবুয়তের ১৩তম বছরে অর্থাৎ
চতুর্থবার ৭৩ জন রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে
সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং
বায়আত নেন। এ বায়আত ‘বায়আতে
আকাবায়ে সানি’ (আকাবার দ্বিতীয়
শপথ) নামে পরিচিত।
রাসুলে পাক হজরত মুহাম্মদ (সা.)প্রথমে মদিনাবাসীকে দ্বীনি দাওয়াতও তালিমের জন্য হজরত মুসআব ইবনেউমায়ের (রা.) ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনেউম্মে মাকতুম (রা.)-কে প্রেরণ করলেন।এরপর হজরত আম্মার (রা.), হজরতবিলাল (রা.) ও হজরত সাআদ (রা.)-কেমদিনায় প্রেরণ করলেন। অবশেষেনবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে রাসুল (সা.)মদিনায় হিজরত করেন। রাসুল (সা.)মদিনা মুনাওয়ারায় প্রবেশের আগেকুবায় অবস্থান করলেন। তিনি তথায়একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন, যামসজিদে কুবা নামে পরিচিত; এটিমদিনার প্রথম মসজিদ। এ মসজিদনির্মাণের সময় রাসুল (সা.) নিজেসবার সঙ্গে পাথর-মাটি বয়ে নিয়েএসেছিলেন; এটি কুবায় বনি সালেমউপত্যকায় অবস্থিত। অতঃপর রাসুল(সা.) জুমার দিনে মদিনায় প্রবেশকরলেন।হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মদিনায়প্রবেশ করলেন, তখন তাঁকে বরণ করারজন্য তাঁর উষ্ট্রীর দড়ি নিয়েটানাটানি শুরু হলো। একপর্যায়ে রাসুল(সা.) বললেন, উষ্ট্রীকে ছেড়ে দাও।যেখানে সে বসবে, সেটাই হবে আমারবাসস্থান। তাকে এমনই নির্দেশ দেওয়াহয়েছে। উষ্ট্রী বনু নাজ্জার গোত্রেরএলাকায় গিয়ে দাঁড়াল। এখানেই রাসুল(সা.)-এর নানার বাড়ি ছিল। এগোত্রের হজরত আবু আইউব আনসারী(রা.)-এর বাড়ির সামনে গিয়ে উষ্ট্রীবসে পড়ল। এখানেই রাসুল (সা.)-এরবাসস্থান নির্ধারণ করা হলো।এখানেই গড়ে উঠল মসজিদে নববি ওমদিনাতুর রাসুল বা রাসুলের শহর। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, জাদুল মাআদ,তারিখুল ইসলাম)।